রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও পুরো মানবজাতির জন্য
হেদায়েতের দিশারি। বিশ্বনবী হিসেবে একাধারে রাষ্ট্র ও যুদ্ধ পরিচালনা, সেনাবাহিনী প্রস্তুতকরণ কিংবা বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দূত পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম দায়িত্ব পালন করতে হতো তাঁকে। তবে এতো মহান দায়িত্ব ও ব্যস্ততার মাঝেও তিনি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতেন, স্ত্রীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তাঁদের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করতেন এবং সার্বিক খোঁজখবর রাখতেন।
স্ত্রীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা
এক রাতে আয়েশা (রা.) বিশ্বনবী (সা.)-কে ‘উম্মে যার’-এর দীর্ঘ কাহিনি শোনান, যেখানে ১১ জন নারী একত্র হয়ে স্বামীদের দাম্পত্য জীবনের কথা শেয়ার করার অঙ্গীকার করেছিলেন। সে আলোচনায় উম্মে যারের স্বামী তাঁর প্রতি যে যত্নশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ফুটে ওঠে। কাহিনি শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-কে ভালোবেসে আশ্বস্ত করে বলেন, "উম্মে যারের কাছে আবু যার যেমন, তোমার কাছে আমিও ঠিক তেমন।" (সহিহ মুসলিম)।
একজন আদর্শ স্বামীর উচিত স্ত্রীর জন্য সময় বের করা এবং তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যস্ততার মাঝেও একটি খুদে বার্তা বা এক মিনিটের ফোন কলের মাধ্যমে স্ত্রীর খোঁজখবর রেখে বৈবাহিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা সম্ভব।
ভালোবাসা প্রকাশে দ্বিধাহীনতা
স্ত্রীকে ভালোবাসা প্রকাশ করা মোটেও পুরুষত্বের পরিপন্থী নয়, বরং তা দাম্পত্যকে সুখী করার শক্তিশালী মাধ্যম। সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) যখন রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?" তিনি নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়েছিলেন, "আয়েশা।" (সহিহ বুখারি)।
নবীজি (সা.) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ঋতুস্রাবের সময় তিনি যে পাত্র থেকে পানি পান করতেন, রাসুল (সা.) নিজ মুখে ঠিক সেই স্থানে ঠোঁট রেখে পানি পান করতেন। এমন স্পর্শ ও আচরণ প্রমাণ করে স্ত্রীর কঠিন সময়ে দূরে না থেকে তাঁর পাশে থাকা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা সুন্নাত।
স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের মনের অবস্থা ও মেজাজ সহজেই বুঝতে পারতেন। আয়েশা (রা.)-কে তিনি একবার বলেন, "তুমি কখন আমার ওপর সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট থাকো, তা আমি বুঝতে পারি। সন্তুষ্ট থাকলে শপথ করে বলো 'মুহাম্মদের রবের কসম', আর অসন্তুষ্ট থাকলে বলো 'ইবরাহিমের রবের কসম'।" আয়েশা (রা.) তা শুনে হেসে তা স্বীকার করেন। (সহিহ বুখারি)।
অসুস্থতায় সান্ত্বনা ও সেবা
পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে নবীজি (সা.) তাঁর কাছে যেতেন, তাঁর ডান হাত অসুস্থ স্থানে রেখে আরোগ্যের জন্য দোয়া করতেন—"হে আল্লাহ! মানবজাতির প্রতিপালক, এই রোগ দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন।" (সহিহ বুখারি)।
প্রয়োজনে স্ত্রীদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও সুরক্ষা
একবার আবু বকর (রা.) রাসুল (সা.)-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাওয়ার সময় মেয়ে আয়েশা (রা.)-কে রাসুল (সা.)-এর চেয়ে উঁচু কণ্ঠে কথা বলতে শোনেন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে আয়েশা (রা.)-কে শাসন করতে গেলে নবীজি (সা.) তাঁদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে আয়েশা (রা.)-কে রক্ষা করেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি রসিকতা করে আয়েশা (রা.)-কে বলেন, "দেখেছ, কীভাবে আজ তোমাকে রক্ষা করলাম!" (মুসনাদে আহমদ)।
ঘরের কাজে সহযোগিতা ও পরিচ্ছন্নতা
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে অবস্থানকালে পরিবারের বিভিন্ন কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন এবং আজান হলে সালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন। (সহিহ বুখারি)।
এছাড়া বাইরের ব্যস্ততা শেষে ঘরে প্রবেশের সময় প্রথমেই তিনি ‘মিসওয়াক’ করতেন, যেন তাঁর মুখ থেকে কোনো দুর্গন্ধ না আসে এবং স্ত্রীর কাছে তা অপ্রীতিকর না ঠেকে। (সহিহ মুসলিম)। পুরুষদেরও উচিত স্ত্রীর জন্য নিজেকে পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন রাখা, যেমনটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উল্লেখ করেছিলেন।
দ্বীনি শিক্ষা ও আচরণে কোমলতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের আনন্দ-রসিকতার পাশাপাশি দ্বীনি দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি বলতেন, "সব সময় কোমলতা অবলম্বন করো। কারণ কোনো কাজের সাথে কোমলতা যুক্ত হলে তা সুমণ্ডিত হয়, আর উঠে গেলে তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে।" (মুসনাদে আহমদ)। ছোট ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকার তাগিদ দিয়ে তিনি পরিবারকে সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান জানাতেন।
এসআর