সকালে রোদঝলমলে চারপাশ দেখে মন ফুরফুরে হয়ে ওঠা কিংবা টানা বর্ষণে হুট করেই
অবসাদগ্রস্ত ও অলস অনুভব করা—এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি এমন মানুষ বিরল।
আবহাওয়ার সঙ্গে আমাদের দৈহিক সম্পর্কের বিষয়টি কেবল তাপমাত্রার ওঠানামাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এই বিষয়টি বিশদভাবে ফুটে উঠেছে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ট্রেভর হার্লির রচিত গ্রন্থ ‘হেড ইন দ্য ক্লাউডস: হাউ দ্য ওয়েদার অ্যাফেক্টস আওয়ার মাইন্ডস অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ’-এ। আবহাওয়ার আলো, উত্তাপ, বৃষ্টি বা ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের ধারা মানুষের প্রতিদিনের মেজাজ ও আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে বইটিতে নানা তথ্য উঠে এসেছে।
১. মানসিক স্বাস্থ্যে আবহাওয়ার ভূমিকা
আমাদের মানসিক অবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি চারপাশের আবহাওয়ার সঙ্গেই মিশে থাকে।
শীতকালে রোদের অভাবের কারণে অনেকের মধ্যেই একধরনের মানসিক অবসাদ তৈরি হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ বা ‘এসএডি’ (SAD)। এই জটিলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা শীতের সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব ও হতাশায় ভুগে থাকেন। এর মূল কারণ পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাব, যা শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা অভ্যন্তরীণ সময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (সার্কেডিয়ান রিদম)-কে বিশৃঙ্খল করে তোলে।
অপরদিকে, তীব্র গরমও মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর বাজে প্রভাব ফেলে। মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে মানুষের খিটখিটে মেজাজ ও মেজাজ হারানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তবে শীতের স্নিগ্ধ পরশ কিংবা মিষ্টি রোদ আবার মনে এনে দেয় প্রশান্তি।
২. মানুষের আচরণে আবহাওয়ার ছাপ
ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের মতোই আবহাওয়া নিয়ে একেকজনের পছন্দ একেক রকম।
কেউ তীব্র গরমে চাঙ্গা বোধ করেন, আবার কেউ বর্ষার দিনে খুঁজে পান অদ্ভূত প্রশান্তি। তবে এর মধ্যে কিছু সার্বজনীন মিলও বিদ্যমান। যেমন—অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র পরিবেশ মানুষকে দ্রুত খিটখিটে ও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, ঝলমলে রোদ মানুষকে আরও সামাজিক ও সৃজনশীল হতে উৎসাহ দেয়; আর মেঘলা বা বৃষ্টির দিনগুলো আমাদের চিন্তাগুলোকে আরও গভীর ও মননশীল করতে সাহায্য করে। বর্ষার পর সোঁদা মাটির ঘ্রাণ কিংবা টানা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মনে গভীর অনুভূতি জাগায়, যা আমাদের কিছুটা ধীরস্থির হতে ও জিরিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
৩. নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়
আবহাওয়াকে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে আবহাওয়ার প্রভাবে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ—গরমের দিনে অহেতুক তর্কে না জড়ানো, শীতকালে ঘরে পর্যাপ্ত আলোর বন্দোবস্ত রাখা কিংবা বৃষ্টির দিনটিকে নিজের মতো করে ইতিবাচক কাজে লাগানো যেতে পারে।
আবহাওয়া আমাদের ওপর প্রভাব ফেললেও, আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখি।
৪. জন্মদিনের ঋতু কি প্রভাব ফেলে?
গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ঋতুতে জন্মগ্রহণের সঙ্গে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব এবং নির্দিষ্ট কিছু মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সুসূক্ষ্ম যোগসূত্র থাকতে পারে। গর্ভকালীন সময় বা শৈশবের শুরুর দিকে সূর্যালোক, তাপমাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা মানুষের শারীরিক ও মানসিক গঠনে ছোট কিন্তু স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. প্রকৃতির বিস্ময় ও মুগ্ধতায় মানসিক বিকাশ
বৃষ্টিশেষে হঠাৎ রোদের দেখা পাওয়া, শীতের মেঠো কুয়াশা কিংবা ঝড়ের ঠিক আগের মেঘের গর্জন—প্রকৃতির এসব রূপ মনের ভেতরে একপ্রকার বিস্ময় ও প্রশান্তি জাগায়। এই মানসিক বিস্ময়বোধ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
ব্যস্ত জীবনের নানা টানাপোড়েনের মাঝে কেবল চোখ তুলে একনজর আকাশের দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যেতে পারে। প্রকৃতির এই রূপান্তরকে সানন্দে গ্রহণ করে আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে চললেই জীবনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর করে তোলা সম্ভব।
এসআর