[email protected] মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বপ্ন দেখানো সেই পেসার আর নেই

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ৭ জুলাই ২০২৬ ৭:৩৩ পিএম

বিরল রক্তজনিত রোগে দীর্ঘদিন ভোগার পর দিল্লির হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আফগানিস্তানের সাবেক পেসার শাপুর জাদরান। ২০১৫ বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আজও আফগান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়।

আফগানিস্তান ক্রিকেটের স্বপ্নযাত্রার অন্যতম স্থপতি আর নেই। দীর্ঘদিন বিরল রক্তজনিত রোগের সঙ্গে লড়াই শেষে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ভারতের দিল্লির একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আফগানিস্তানের সাবেক বাঁহাতি পেসার শাপুর জাদরান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৮ বছর।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তিনি হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (HLH) নামে অত্যন্ত বিরল ও জটিল একটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কাবুল থেকে দিল্লিতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

শাপুরের ছোট ভাই ঘামাই জাদরান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে আফগানিস্তান ক্রিকেটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটার, ক্রিকেট বোর্ড এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা শাপুরকে স্মরণ করে শোক প্রকাশ করেন।

আফগান ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম নায়ক ছিল জাদরান। বিশ্ব ক্রিকেটে আফগানিস্তানের পথচলা সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন যাত্রায় শাপুর জাদরান ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।

২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর প্রায় এক দশক আফগানিস্তানের পেস আক্রমণের নেতৃত্ব দেন তিনি। বাঁহাতি পেস, আক্রমণাত্মক বোলিং এবং আগ্রাসী মনোভাবের কারণে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের কাছে ছিলেন ভয়ংকর এক নাম।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৪৪টি ওয়ানডেতে ৪৩টি এবং ৩৬টি টি-টোয়েন্টিতে ৩৭টি উইকেট শিকার করেন তিনি। সব মিলিয়ে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর উইকেট সংখ্যা ৮০।

২০১৫ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্স ছিল জাদরানের। শাপুর জাদরানের নাম উচ্চারণ করলেই আফগান সমর্থকদের চোখে ভেসে ওঠে ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরে বল হাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ১০টি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। আজও বিশ্বকাপে কোনো আফগান বোলারের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড এটি।

বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক প্রথম বিশ্বকাপ জয়ে তাঁর বোলিং ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। ম্যাচ শেষে দুই হাত ডানা মেলার মতো ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর উদযাপন আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ছাড়া ২০১০, ২০১২, ২০১৪ ও ২০১৬—টানা চারটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন এই পেসার। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও পরিচিত মুখ ছিলেন শাপুর জাদরান।

জাতীয় দলের হয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে একাধিক ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এ অংশ নিয়ে নিজের আগ্রাসী বোলিং ও প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। মাঠের বাইরে হাসিখুশি স্বভাবের কারণে সতীর্থদের কাছেও ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়।

আফগান ক্রিকেট বোর্ডের শোক: শাপুরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)।

এক শোকবার্তায় বোর্ড জানায়,

"শাপুর জাদরান শুধু একজন দুর্দান্ত ক্রিকেটারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাহস, সংগ্রাম ও স্বপ্ন দেখার প্রতীক। তাঁর লড়াকু মানসিকতা পুরো একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। আফগান ক্রিকেটে তাঁর অবদান কখনো ভোলার নয়।"

সাবেক অধিনায়ক ও সতীর্থরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপুরের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা আর সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্য থেকেও বিশ্ব ক্রিকেটে আফগানিস্তানের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে গল্প, সেখানে শাপুর জাদরানের নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। হয়তো আর দেখা যাবে না তাঁর লম্বা চুল উড়িয়ে ছুটে আসা সেই বিখ্যাত রান-আপ কিংবা উইকেট নেওয়ার পর দুই হাত মেলে ধরা উদযাপন। কিন্তু আফগান ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলার পেছনে তাঁর অবদান, লড়াকু মানসিকতা আর অনুপ্রেরণার গল্প ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল। তাঁর বিদায়ে শুধু একজন ক্রিকেটার নয়, হারিয়ে গেল আফগান ক্রিকেটের উত্থানের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

এসআর

সম্পর্কিত খবর