[email protected] সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
২২ আষাঢ় ১৪৩৩

ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ, নেইমারের বিদায়ের ইশারা; শেষ হলো এক বর্ণিল অধ্যায়?

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ৬ জুলাই ২০২৬ ৫:৪৪ এএম

নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আবেগাপ্লুত নেইমার বললেন, ‘অনেক চেষ্টা করেছি।’ অভিষেকের স্টেডিয়ামেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ইঙ্গিত দিলেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে সেলেসাওদের এই পরাজয়ের চেয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন নেইমার জুনিয়র। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের মাঝখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলের পোস্টার বয়। এরপর ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে দেন তিনি।

বিশ্বকাপজুড়ে চোটের সঙ্গে লড়াই করে মাঠে ফেরা নেইমার অতিরিক্ত সময়ের ১০০তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন। কিন্তু সেই গোলও দলকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি। চোখের পানি লুকাতে পারেননি ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ge-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবেগঘন কণ্ঠে নেইমার বলেন, বিশ্বকাপ জয়ের যে স্বপ্ন তিনি শৈশব থেকে বুকে লালন করে এসেছেন, সেটি আর পূরণ হলো না।

‘যেখানে শুরু, সেখানেই শেষ’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে নেইমার বলেন, “আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বারবার ফিরে এসেছি, বারবার লড়েছি। কিন্তু মনে হচ্ছে, এবার থামার সময় এসেছে। আমার শুরুটা যেখানে হয়েছিল, শেষটাও সেখানেই হলো।”

নেইমারের এই বক্তব্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক আবেগঘন ইতিহাস। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। ১৬ বছর পর সেই একই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ের ইঙ্গিত দিলেন তিনি।

যে মাঠে শুরু হয়েছিল স্বপ্নের পথচলা, সেখানেই যেন লেখা হলো বিদায়ের শেষ অধ্যায়। অপূর্ণ থেকে গেল বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। ব্রাজিলের হয়ে একের পর এক রেকর্ড গড়লেও বিশ্বকাপ ট্রফি কখনোই ছুঁয়ে দেখা হয়নি নেইমারের।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে ভয়াবহ চোটে ছিটকে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতেই জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক ৭-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল।

২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে পরাজয়, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হৃদয়ভাঙা বিদায়, আর ২০২৬ সালে নরওয়ের কাছে শেষ ষোলোতেই বিদায়—প্রতিবারই বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙেছে তাঁর চোখের সামনেই।

এর মাঝেই ২০২৩ সালে হাঁটুর গুরুতর চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন আর হয়তো জাতীয় দলে ফেরা হবে না। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করে আবারও বিশ্বকাপে ফিরেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি।

বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষ প্রহরের দিকে নেইমার। জাতীয় দলের হয়ে ১০০-এর বেশি ম্যাচ খেলা নেইমার ইতোমধ্যেই কিংবদন্তি পেলের গোলের রেকর্ড ভেঙে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। অসংখ্য শিরোপা, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত এবং এক প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা অর্জন করলেও বিশ্বকাপ ট্রফিটাই থেকে গেল তাঁর সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।

ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) পক্ষ থেকে এখনো তাঁর অবসরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে ম্যাচ শেষে নেইমারের আবেগঘন বক্তব্য, সতীর্থদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গন এবং গ্যালারির দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানানোর দৃশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে—হয়তো ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে আর দেখা যাবে না এই মহাতারকাকে।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে চোখের জলে ভেজা সেই বিদায়ের মুহূর্তটি তাই শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়, বরং ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল এক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর