ব্রুনো গুইমারেসের পেনাল্টি মিসই কাল হয়ে দাঁড়াল ব্রাজিলের জন্য; শেষদিকে নেইমারের গোলেও রক্ষা হয়নি, জোড়া গোলে নরওয়েকে শেষ আটে তুললেন আর্লিং হালান্ড।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আবারও ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষ, আবারও স্বপ্নভঙ্গ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের নকআউটে ইউরোপের বিপক্ষে যে অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে ব্রাজিল, ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত জোড়া গোল এবং গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ডের অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় ভর করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।
নকআউট পর্বে টিকে থাকার লড়াইয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ব্রাজিল। উল্টো সুযোগ পেলেই শাস্তি দিয়েছে নরওয়ে। শেষ পর্যন্ত নেইমারের যোগ করা সময়ের পেনাল্টি গোলও কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, হার এড়াতে পারেনি সেলেসাওরা।
এই জয়ে আগামী ১১ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে স্টালে সলবাক্কেনের দল। অন্যদিকে, সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে হতাশার বিদায় নিতে হলো নেইমার জুনিয়রকে।
শুরুর দিকেই ভিএআর নাটক, এরপর পেনাল্টি মিসের হতাশা। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। ৮ মিনিটের মাথায় মার্টিন ওডেগার্ডের নিখুঁত পাস থেকে আলেকজান্ডার সোরলোথ বল বাড়িয়ে দেন প্যাট্রিক বার্গকে। তিনি বল জালে জড়ালেও ভিএআর পর্যালোচনায় সোরলোথ অফসাইডে থাকায় গোলটি বাতিল হয়।
গোল বাতিলের ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রাজিল। ২১তম মিনিটে মাথেউস কুনিয়াকে বক্সের ভেতরে ফাউল করেন নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ের। ভিএআর দেখে রেফারি ইসমাইল এলফাত পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
স্পট কিক নিতে আসেন ব্রুনো গুইমারেস। কিন্তু তাঁর নিচু শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ড। বিশ্বকাপের নকআউটে এই পেনাল্টি মিসই পরে ম্যাচের সবচেয়ে বড় মোড় হয়ে দাঁড়ায়।
পেনাল্টি মিসের পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও রাফিনিয়া একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও প্রতিবারই নরওয়ের রক্ষণ কিংবা নাইল্যান্ড হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।
আনচেলত্তির কৌশলও কাজে এল না। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি বাড়াতে ৫৮ মিনিটে তরুণ ফরোয়ার্ড এনড্রিককে মাঠে নামান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বদলি হিসেবে নেমেই দারুণ একটি সুযোগ পেয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। কিন্তু গোলরক্ষককে একা পেয়েও তাঁর শট পোস্টের বাইরে চলে যায়। এই মিসের কয়েক মিনিট পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নরওয়ের হাতে চলে যায়। হালান্ডের ঝড়ে ভেঙে পড়ে ব্রাজিল।
৭৯তম মিনিটে বদলি আন্দ্রেয়াস শিয়েল্ডারুপের ভাসানো ক্রসে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডারকে হারিয়ে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন আর্লিং হালান্ড। অ্যালিসনের কোনো সুযোগই ছিল না।
গোল হজম করার পর সমতায় ফিরতে পুরো দল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রাজিল। কিন্তু সেই সুযোগই কাজে লাগায় নরওয়ে।
নির্ধারিত সময়ের ৯০তম মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে আবারও শিয়েল্ডারুপের কাছ থেকে বল পান হালান্ড। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর ভয়ংকর বাঁ পায়ের শট সোজা জালে জড়িয়ে গেলে স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-০।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচেই গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার।
শেষ মুহূর্তে নেইমারের গোল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি। অতিরিক্ত সময়ের ৯০+১০ মিনিটে ক্যাসেমিরোকে বক্সের ভেতরে লিও ওস্টিগার্ড ফাউল করলে দ্বিতীয় পেনাল্টি পায় ব্রাজিল।
এবার দায়িত্ব নেন নেইমার। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-১ করলেও সময় তখন প্রায় শেষ। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমে আসে নরওয়ের উল্লাস, আর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ও সমর্থকদের চোখে দেখা যায় অশ্রু।
নাইল্যান্ডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় সেলেসাওগের কাছে।ম্যাচের ফল নির্ধারণে হালান্ডের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ডের। গুইমারেসের পেনাল্টি ঠেকানোর পাশাপাশি ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেল্লি, রাফিনিয়া ও এনড্রিকের একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। ম্যাচসেরা পারফরম্যান্সে নরওয়ের জয়কে বাস্তবে রূপ দেন এই গোলরক্ষক।
ইউরোপিয়ান অভিশাপ আরও দীর্ঘ হলো ব্রাজিলের। এই হারের মাধ্যমে ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর নকআউট পর্বে ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে টানা সপ্তমবার পরাজিত হলো ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে বেলজিয়াম, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া এবং এবার ২০২৬ সালে নরওয়ের কাছে হেরে আবারও বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে গেল সেলেসাওদের।
অন্যদিকে, হালান্ডের জোড়া গোল, নাইল্যান্ডের দুর্দান্ত গোলকিপিং এবং গোটা দলের শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সে নতুন ইতিহাস গড়ল নরওয়ে। বিশ্বকাপের শেষ আটে উঠে এখন তাদের চোখ আরও বড় স্বপ্নের দিকে।
এসআর