হ্যাটট্রিক সাফ শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমে জয় দিয়েই টুর্নামেন্ট শুরু করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। নিজেদের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপকে ৪-২ গোলে হারিয়ে আসরে শুভ সূচনা করেছে কোচ পিটার বাটলার-এর শিষ্যরা।
তবে স্কোরলাইন বড় হলেও ম্যাচটি মোটেও একতরফা ছিল না। প্রথম ম্যাচে একই মালদ্বীপকে ১১-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল ভারত। সেই তুলনায় বাংলাদেশের বিপক্ষে অনেক বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে মালদ্বীপ। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে তারা বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে বেশ ভুগিয়েছে।
১৩ সেকেন্ডেই আনিকার গোল, স্বপ্নের সূচনা: ম্যাচ শুরুর মাত্র ১৩ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে বাংলাদেশকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেন সুইডেনপ্রবাসী ফুটবলার আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। ম্যাচের শুরুতেই এমন দ্রুত গোল যেন বড় জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
মূলত উইঙ্গার হিসেবে পরিচিত আনিকাকে এদিন স্ট্রাইকার পজিশনে খেলান কোচ পিটার বাটলার। গত আসরের পাঁচ গোলদাতা তহুরা খাতুনকে বেঞ্চে রেখে একাদশে সুযোগ পেয়েই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি।
তিন মিনিটেই ব্যবধান দ্বিগুণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ঋতুপর্ণা চাকমার অলিম্পিক গোলের চেষ্টা সেকেন্ড বারে লেগে ফিরে আসে। ভাগ্য সহায় হলে শুরুতেই বড় ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ।
প্রথমার্ধে দাপট বাংলাদেশের, শুরুতে গোল হজম করে কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়ে মালদ্বীপ। সেই সুযোগে আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ। একের পর এক আক্রমণে চাপে পড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ।
মালদ্বীপের গোলরক্ষক ফাতিমাত সুজান না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। বেশ কয়েকটি নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
৩৪ মিনিটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোল আসে। সতীর্থের বাড়ানো বল পেয়ে ফাঁকা বক্সে ঢুকে জোরালো শটে বল জালে পাঠান উমহেলা মারমা। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে উল্লাসে মাতে বাংলাদেশ শিবির।
পুরো প্রথমার্ধে আধিপত্য ছিল বাংলাদেশেরই। তবে ৪৩ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে গিয়ে একটি গোল শোধ করে মালদ্বীপ। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে মারিয়াম নুরার দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট ক্রসবারে লেগে জালে জড়ায়। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের কিছু করার ছিল না।
এই গোলের পর ব্যবধান দাঁড়ায় ২-১, যা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে নামে মালদ্বীপ। বাংলাদেশের রক্ষণভাগের দুর্বলতা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।
৫৩ মিনিটে বড় সুযোগ পেয়েছিলেন মারিয়াম রিফা। তবে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তার একা পেয়েও তাকে গোল করতে দেননি। কিন্তু তিন মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি। আমিনাথ ফাজলার গোলে সমতায় ফেরে মালদ্বীপ।
এই গোলে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারের ট্যাকল মিস বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সহজ একটি বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হওয়ায় সুযোগ পেয়ে যায় প্রতিপক্ষ।
সমতায় ফেরার পর কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। তবে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। ৬৪ মিনিটে ঋতুপর্ণা চাকমার দারুণ এক ক্রস প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন মালদ্বীপের গোলরক্ষক। সুযোগ বুঝে বল জালে জড়িয়ে দেন সুরভী আকন্দ প্রীতি। আবারও এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
এরপর একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও গোলের দেখা মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে ঋতুপর্ণার ফ্রি-কিক থেকে হেডে গোল করেন কোহাতি কিসকু। তাতেই ৪-২ গোলের জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।
জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও বাংলাদেশের ডিফেন্স নিয়েভাবনার জায়গা রয়ে গেছে। সহজ কিছু ভুল এবং সমন্বয়হীনতা কাজে লাগিয়ে মালদ্বীপ দুই গোল আদায় করে নেয়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই দুর্বলতা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো—দলটি চাপের মুহূর্তে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। নতুন কৌশল, নতুন পজিশনে খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়া এবং আক্রমণভাগের কার্যকারিতা কোচ পিটার বাটলারের জন্য স্বস্তির বিষয়।
হ্যাটট্রিক শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামা বাংলাদেশের জন্য জয় দিয়ে শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কাজ সফলভাবেই করেছে লাল-সবুজের মেয়েরা।
এখন সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। ডিফেন্সের ভুল কমিয়ে আক্রমণের ধার বজায় রাখতে পারলে এবারের সাফেও শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন আরও জোরালো হবে বাংলাদেশের জন্য।
এসআর