[email protected] বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ইসলামে পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের শিক্ষা এবং দায়িত্বশীলতা

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মানবজীবনের অন্যতম মৌলিক ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। পানীয়, কৃষিকাজ,

 পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে জীবিকা—সবকিছুর সঙ্গেই পরিবেশ ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ইসলাম মানুষকে এসব নিয়ামত ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি তা সঠিক উপায়ে ব্যবহার ও সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। অপচয় ও অহেতুক ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থেকে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাই ইসলামী জীবনদর্শনের অন্যতম মূলভিত্তি।

​ইসলাম যেভাবে মানুষকে পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলে:

​পানি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত

পানি মহান আল্লাহর দেওয়া এক অনন্য নিয়ামত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা পানি থেকেই সমস্ত জীবন্ত সত্তা সৃষ্টি করেছেন (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)। মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের অস্তিত্ব এই পানির ওপরই নির্ভর করে। ফলে একে অসীম মনে করে অপচয় করা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। প্রয়োজনে পরিমিত পানি ব্যবহার করা এবং অন্যের হকের কথা মনে রাখাই একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়।

​পানি ব্যবহারে অপচয় নিষিদ্ধ

ইসলামী নীতিতে খাদ্য ও সম্পদের পাশাপাশি পানির অপচয়কেও কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)। এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্র অজুর মতো কাজেও পরিমিত পানি ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। প্রখ্যাত সাহাবি সাদ (রা.) অজু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলে মহানবী (সা.) তাকে সতর্ক করেন এবং বলেন, নদীর তীরে বসে অজু করলেও পানির অপচয় করা যাবে না (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তাই দৈনন্দিন জীবনে অহেতুক কল খুলে রাখা কিংবা পানির উৎস নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

​প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ

পৃথিবীর সমস্ত বস্তু মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি হলেও এর প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর এবং মানুষ এর আমানতদার। কোরআনে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও অনাচার সৃষ্টি করতে বারণ করা হয়েছে (সুরা বাকারা, আয়াত: ৬০)। মাটি, নদী, বন কিংবা কৃষিজমির বেপরোয়া ব্যবহার বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পদ ব্যবহার করা জরুরি।

​পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের তাগিদ

প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে এবং সেখান থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা পশু কিছু ভক্ষণ করে, তবে তা রোপণকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয় (সহিহ বুখারি: ২৩২০, সহিহ মুসলিম: ১৫৫২)। একটি গাছ রোপণের মাধ্যমে মানুষ ফল, ছায়া ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের স্থায়ী উপকার লাভ করে।

​জীবজন্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ

প্রকৃতির উপাদান হিসেবে পশুপাখির প্রতি দয়া দেখানোর সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে ইসলামে। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর দরুন মহান আল্লাহ এক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা জানতে চাইলে আল্লাহর রাসুল (সা.) জানান, যেকোনো জীবন্ত প্রাণীর সেবা করা বা দয়া দেখানোর মধ্যেও সওয়াব রয়েছে (সহিহ বুখারি: ২৩৬৩)।

​ভোগে পরিমিতিবোধ ও সংরক্ষণ

সম্পদ ব্যবহারে পরিমিতিবোধ নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি। অতিরিক্ত ভোগ ও অপচয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। পানি ও বিদ্যুতের সচেতন ব্যবহার, খাদ্যের অপচয় রোধ এবং জলাশয় রক্ষা করা আধুনিক যুগের অন্যতম নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব, যা ইসলামের অপচয়বিরোধী ব্যবস্থার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

​ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমানত

প্রাকৃতিক উপাদানগুলো কেবল বর্তমান সময়ের ভোগপণ্যের বিষয় নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জীবন ধারণের জন্য এটি একটি আমানত। নিজের ইচ্ছামতো সম্পদ ধ্বংস না করে পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়াই ইসলামের শিক্ষা।

​জনকল্যাণে পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা

ইসলামী ইতিহাসে সাধারণ মানুষের জন্য পানির সুব্যবস্থা করাকে অন্যতম সেরা জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, কুয়া বা নলকূপ স্থাপন এবং তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো সদকায়ে জারিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।

​মূলত, পানি ও পরিবেশের নিয়ামতগুলোকে অপচয় না করে রক্ষা করা, বৃক্ষরোপণ করা, প্রাণীর প্রতি মানবিক হওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবাই ইসলামী নৈতিকতার শিক্ষা। জীবনযাত্রায় এই আদর্শগুলোর প্রতিফলন ঘটলে ব্যক্তিগত সংযমের পাশাপাশি সমাজে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

এসআর

সম্পর্কিত খবর