[email protected] মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

কোরআন বাস্তবায়নে সুন্নাহ ও হাদিসের আবশ্যকতা

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮:৪৯ এএম

সংগৃহীত ছবি

ইসলামের মূল দুটি ভিত্তি হলো পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ। কোরআন মাজিদ হলো স্বয়ং আল্লাহর

 বাণী, আর সুন্নাহ হলো শেষনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনধারা। মহানবী (সা.)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনের মাধ্যমে কোরআনের যাবতীয় নির্দেশাবলী কীভাবে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জানা যায়। এ কারণে ইসলামের মূল চেতনা ও বিধান বোঝার ক্ষেত্রে হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম।

​সুন্নাহ বলতে কী বোঝায়?

​সুন্নাহ বলতে মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথামালা, তাঁর কাজ এবং তাঁর উপস্থিতিতে অন্য কারও করা কোনো কাজের প্রতি দেওয়া নীরব সমর্থন বা সম্মতিকে বোঝায়।

​অনেক সময় ধর্মীয় পরিভাষায় সুন্নাহ বলতে এমন কিছু আমলকেও নির্দেশ করা হয় যা বাধ্যতামূলক নয় বা ঐচ্ছিক। তবে মৌলিক আলোচনায় ‘সুন্নাহ’ বলতে মহানবী (সা.)-এর সংরক্ষিত বাণী বা হাদিস ঐতিহ্যকে বোঝায়।

​এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআনের পরেই হাদিসের অবস্থান। হাদিসের সহায়তা ব্যতিরেকে কোরআনকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা অসম্ভব। একইভাবে কোরআনের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে কোনো হাদিসের ব্যাখ্যাও পরিপূর্ণতা পায় না।

​পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পারস্পরিক সম্পর্ক

​কোরআন হলো মহান আল্লাহর ঐশী বার্তা বা মূল সংবিধান। আর হাদিস হলো সেই সংবিধানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মৌখিক ব্যাখ্যা, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের জীবনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। সংক্ষেপে বলা যায়, কোরআন হলো সুন্নাহর তাত্ত্বিক ভিত্তি, আর সুন্নাহ হলো কোরআনের নির্দেশসমূহের প্র্যাকটিক্যাল বা বাস্তব রূপ।

​নবীজির ওপর অর্পিত দায়িত্ব

​মানবজাতির কাছে কেবল ঐশী বাণী পৌঁছে দেওয়াই রাসুলের একমাত্র দায়িত্ব ছিল না; বরং সেই বাণীর গূঢ় রহস্য ব্যাখ্যা করা এবং দৈনন্দিন জীবনে তা বাস্তবায়নের উপায় শেখানোও তাঁর দায়িত্বের অংশ ছিল।

​এই কারণেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:

​বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। এরপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব শুধু তার, আর তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তোমাদের। তোমরা যদি তার আনুগত্য করো, তবে সঠিক পথ পাবে। রাসুলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্টভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। (সুরা নূর, আয়াত: ৫৪)

 

​এই আয়াতটি মুমিনদের জীবনে হাদিসের গুরুত্ব সুস্পষ্ট করে তোলে। হাদিসে বর্ণিত মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা জানা ও অনুসরণে আত্মনিয়োগ করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য, যা অবহেলা করলে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

​হাদিসের মূল গুরুত্ব

​হাদিসের গুরুত্ব বিচারে দুটি বড় দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তাঁর মনোনীত রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। সুতরাং আল্লাহর এই বাণী আমরা মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমেই লাভ করেছি। একইসাথে তিনি কোরআনের বিভিন্ন নির্দেশনার প্র্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। নবীজির দেওয়া এই স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলে মানুষের পক্ষে কোরআনের অর্থ ভুলভাবে বোঝার ব্যাপক আশঙ্কা থাকত। এ কারণেই কীভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে এবং বুঝতে হবে, তা ব্যাখ্যা ও নিজ উদাহরণের মাধ্যমে সাহাবিদের শিখিয়েছেন মহানবী (সা.)। অর্থাৎ হাদিসের গুরুত্ব মূলত কোরআনের গুরুত্বের সাথেই গভীরভাবে সংপৃক্ত।

​উদাহরণ হিসেবে সালাত বা নামাজের কথা বলা যায়। কোরআনে নামাজ কায়েমের নির্দেশ থাকলেও এর পুঙ্খানুপুঙ্খ পদ্ধতি বর্ণিত হয়নি। কিন্তু কীভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, তা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে বিস্তারিত শিখিয়েছেন। একইভাবে নবীজির শিক্ষা ও সুন্নাহ ছাড়া আমরা নামাজ, রোজা, জাকাত কিংবা হজের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম জানতে পারতাম না। এসব মৌলিক ইবাদতের যাবতীয় বিবরণ হাদিসেই সংরক্ষিত, কোরআনে নয়।

​ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট বা শানে নুজুল

​মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলী ও বিশেষ পরিস্থিতিতে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত নাজিল হয়েছে। যদিও অনেক আয়াতের মূল শিক্ষা ও তাৎপর্য নির্দিষ্ট ঘটনার বাইরেও সর্বজনীন, তবুও এমন বহু আয়াত রয়েছে যা নাজিল হওয়ার পেছনের বাস্তব পটভূমির আলোকে দেখলেই কেবল সঠিক অর্থ বোঝা সম্ভব।

​যেমন সুরা আলে ইমরানের একটি আয়াতে বলা হয়েছে:

​তোমার কাছে জ্ঞান আসার পরও এ বিষয়ে যে তোমার সঙ্গে বিতর্ক করে, তাকে বলো, এসো, আমরা আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের, আমাদের নারীদের এবং তোমাদের নারীদের, আমাদের নিজেদের এবং তোমাদের নিজেদের ডেকে নিই। তারপর আমরা সবাই আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি এবং যারা মিথ্যাবাদী, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করি। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬১)

 

​এই আয়াতে মূলত ‘মুবাহালা’র (মিথ্যাবাদীর ওপর অভিশাপ বর্ষণের যৌথ প্রার্থনা) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক আলোচনা ও বাহাসের প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল।

​এই দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোরআনের অনেক আয়াতের সঠিক ভাবার্থ জানতে মহানবী (সা.)-এর জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপটের দিকে চোখ ফেরাতে হয়।

​কোরআন অনুসরণে হাদিসের ভূমিকা

​ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাস্তব ক্ষেত্রে হাদিস কোরআনের বক্তব্যকে ব্যাখ্যাকৃত, স্পষ্ট ও সংক্ষেপিত করে উপস্থাপিত করে। হাদিসকে বাদ দিলে কোরআনের মূল বার্তা ভুলভাবে বোঝার ঝুঁকি থাকে।

​কোরআনে আল্লাহ তাআলা কেবল রাসুলের আনুগত করতেই নির্দেশ দেননি, বরং জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:

​কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। এরপর তুমি যে সিদ্ধান্ত দাও, সে বিষয়ে তাদের অন্তরে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং তারা পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নেয়। (সুরা নিসা, আয়াত: ৬৫)

 

​রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গৃহীত এসব সিদ্ধান্ত মূলত হাদিসের গ্রন্থসমূহে সংরক্ষিত রয়েছে। অতএব, নবীজির সিদ্ধান্তসমূহ সানন্দচিত্তে মেনে নেওয়া প্রতিটি মুসলমানের জন্য ঈমানী দায়িত্ব।

​পবিত্র কোরআন আরও নির্দেশ দেয়—মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে সর্বোচ্চ অনুকরণীয় হিসেবে গ্রহণ করতে। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ হিসেবে তাঁর আদর্শ অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে মহানবী (সা.)-এর নৈতিক চরিত্রকে নিজের জীবনে রূপ দেওয়া আবশ্যক। আর হাদিস চর্চা ছাড়া তাঁর সেই অনুপম চরিত্র জানা অসম্ভব।

​এ প্রসঙ্গে হজরত আয়েশা (রা.)-এর একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি সংক্ষেপে বলেছিলেন, “পবিত্র কোরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।”

​অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন কোরআনে বর্ণিত সর্বাধুনিক আদর্শ ও মানবীয় গুণাবলীর বাস্তব মূর্তপ্রতীক। সুতরাং যে হাদিসে নবীজির বাস্তব জীবন ও তার প্রয়োগ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে, তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

এসআর

সম্পর্কিত খবর