বন্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি ধর্মীয় ইবাদত পালনের ক্ষেত্রেও নানা প্রশ্নের জন্ম
দেয়। চারদিকে থৈ থৈ করা বন্যার পানি অজুর জন্য ব্যবহার করা যাবে কি না, কিংবা এই পানি নাপাক কি না—তা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় জাগে। দুর্যোগের সময়েও মানুষের সামর্থ্য ও বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে ইসলাম সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান দিয়েছে।
ইসলামে পানির মূল বিধান:
ইসলামী শরিয়তের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, পানি মূলত পবিত্র (طاهر) এবং পবিত্রকারী (مطهر)। কোনো পানি নিশ্চিতভাবে অপবিত্র হওয়ার প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পবিত্র বলেই গণ্য করা হয়। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘পানি পবিত্র ও পবিত্রকারী; কোনো কিছুই তাকে (নিজে থেকে) অপবিত্র করে না।’ (আবু দাউদ ৬৬, তিরমিজি ৬৬)
সুতরাং, কেবল বন্যার পানি হওয়ার কারণেই তা নাপাক হয়ে যায় না।
বন্যার ঘোলা পানি দিয়ে অজুর নিয়ম:
বন্যার পানিতে মাটি বা বালু মিশে পানি ঘোলা হতে পারে। হানাফি ফিকহের নির্দেশনা অনুযায়ী, যদি পানির সঙ্গে কোনো পবিত্র বস্তু মিশে তার রং, স্বাদ বা গন্ধে পরিবর্তন আসে, কিন্তু তা তখনও পানি হিসেবেই গণ্য হয় এবং তার প্রবাহমান বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে, তবে সেই পানি দিয়ে অজু ও গোসল করা সম্পূর্ণ বৈধ (আল-হিদায়াহ ১/৩৪)। অতএব, শুধু ঘোলা হওয়ার কারণে বন্যার পানি দিয়ে অজু করা নিষিদ্ধ নয়।
কখন বন্যার পানি ব্যবহার করা যাবে না?
নাপাকির নিশ্চিত প্রমাণ: যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে পানিতে নাপাক বস্তু মিশেছে এবং এর ফলে পানির রং, গন্ধ কিংবা স্বাদ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তবে তা দিয়ে অজু-গোসল করা যাবে না।
সন্দেহের অবকাশ নেই: কেবল সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে পানিকে নাপাক বলা যাবে না। ইসলামী ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— ‘নিশ্চিত বিষয় কেবল সন্দেহের কারণে দূর হয় না।’
প্রবাহমান পানির বিধান: ফাতাওয়া আলমগীরির (১/১৬–১৭) ব্যাখ্যানুযায়ী, প্রবাহমান পানিতে নাপাক বস্তু পড়লেও যদি তার রং, গন্ধ বা স্বাদে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে সেই পানি পবিত্র থাকে এবং তা দিয়ে অজু করা যায়।
পানি ব্যবহারের বিকল্প (তায়াম্মুম):
বন্যার পানি যদি অতিরিক্ত দূষিত বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়, কিংবা পানি সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তবে ইসলামে সহজ বিকল্প রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন—
‘যদি তোমরা পানি না পাও (অথবা ব্যবহার করতে সক্ষম না হও), তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।’ (সুরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৬)
ফকিহদের মতে, পানি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যদি তা ব্যবহার করা অসম্ভব বা ক্ষতিকর হয়, তবে তায়াম্মুম করা বৈধ।
বন্যা পরিস্থিতিতে মুসলিমদের করণীয়:
১. বন্যার পানি ব্যবহারের আগে তা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।
২. নিশ্চিত নাপাকি না থাকলে অযথা সন্দেহের বশে ইবাদত ত্যাগ করবেন না।
৩. পরিষ্কার পানি ও নিরাপদ স্বাস্থ্যঝুঁকিহীন উৎস পাওয়া গেলে সেটিকে অগ্রাধিকার দিন।
৪. শারীরিক বা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থাকলে শরিয়তের ছাড় (রুখসত) গ্রহণ করে প্রয়োজনে তায়াম্মুম করুন।
৫. দুর্যোগের সময়ে অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি নির্দেশনার আলোকে ইবাদত পালন করুন এবং সঠিক মাসআলা প্রচার করুন।
এসআর