[email protected] রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
২১ আষাঢ় ১৪৩৩

ইমাম ইবনুল কাইয়িম: কারাগারের নির্যাতন থেকে কালজয়ী গ্রন্থ প্রণেতা

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ জুলাই ২০২৬ ৮:২৭ এএম

সংগৃহীত ছবি

হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, ফকিহ, উসুলবিদ ও ভাষাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ

 (রহ.) ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরিচয়—তিনি ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কারক ও মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে তায়মিয়ার সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রধান অনুসারী। দীর্ঘ ১৭ বছর শিক্ষকের সান্নিধ্যে কাটানোর পাশাপাশি তাঁর বৈপ্লবিক মতাদর্শের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কারাবরণও করেছেন তিনি। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে জ্ঞানচর্চার প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি অসংখ্য অমর গ্রন্থ রেখে গেছেন।

​জন্ম পরিচয় ও নামের রহস্য

​ইবনুল কাইয়িম ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে (৬৯১ হিজরি) সফর মাসে সিরিয়ার দামেস্কের এক ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবু বকর। তাঁর পিতা দামেস্কের তৎকালীন বিখ্যাত ‘জাওজিয়াহ’ মাদ্রাসার প্রধান বা ‘কাইয়িম’ (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। পিতার এই পদবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে তিনি ‘ইবনে কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ’ নামে পরিচিতি পান। পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশের সুবাদে শৈশব থেকেই তিনি দামেস্কের প্রথিতযশা আলেমদের অধীনে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।

​দীর্ঘ শিক্ষা জীবন ও শিক্ষকদের তালিকা

​তৎকালীন দামেস্কের শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছ থেকে তিনি হাদিস, কোরআনের তাফসির ও আরবি সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষকদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন তাঁর পিতা আবু বকর বিন আইয়ুব, শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম সাফিউদ্দিন আল-হিন্দি, শিহাব আল-আবের, হাফেজ আল-মিজ্জি এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ হাফেজ আজ-জাহাবি।

​ইবনে তায়মিয়ার সান্নিধ্য ও ১৭ বছরের কারাজীবন

​তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ইমাম ইবনে তায়মিয়ার সংস্পর্শে আসার পর। ইবনে তায়মিয়ার জীবনের শেষ ১৭ বছর তিনি ছায়ার মতো শিক্ষকের পাশে ছিলেন। শিক্ষকের স্বাধীন ও সংস্কারপন্থী চিন্তাধারা তাঁকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। এই একনিষ্ঠতার কারণে দামেস্ক দুর্গে শিক্ষকের সাথে তাঁকেও বন্দি হতে হয় এবং সেখানে তিনি কঠোর নির্যাতনের মুখোমুখি হন। ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে ইবনে তায়মিয়ার মৃত্যুর পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

​মাজহাব ও স্বাধীন বিচারবুদ্ধি

​দামেস্কের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী ইবনুল কাইয়িম প্রথম জীবনে হাম্বলী মাজহাবের অনুসরণে বড় হলেও জ্ঞানচর্চায় পরিপক্বতা আসার পর এবং শিক্ষক ইবনে তায়মিয়ার প্রভাবে অন্ধ অনুকরণ বর্জন করেন। তিনি সরাসরি পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনভাবে ফতোয়া দেওয়ার নীতি বেছে নেন। এর ফলে সমকালীন প্রথাগত ফতোয়ার বাইরে গিয়ে তিনি বেশ কিছু নিজস্ব মতামত দেন। যেমন—একই মজলিসে এক শব্দে তিন তালাক দিলে তা একটি তালাক হিসেবে গণ্য হওয়া এবং কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার বৈধতা দেওয়া। এসব স্বাধীন রায়ের কারণে সমসাময়িক ফকিহদের তীব্র বিরোধিতা ও শাস্তির মুখোমুখি হলেও তিনি আমৃত্যু নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন।

​সুযোগ্য শিষ্য ও অমর সাহিত্যকর্ম

​ইবনে কাইয়িমের তত্ত্বাবধানে ইসলামের ইতিহাসের বহু প্রখ্যাত স্কলার তৈরি হয়েছেন। তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ ও ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’র রচয়িতা হাফেজ ইবনে কাসির, ‘তাবাকাতুল হানাবিলা’র লেখক ইবনে রজব আল-হাম্বলি এবং বিখ্যাত আরবি অভিধান ‘আল-কামুস আল-মুহিত’-এর প্রণেতা মাজদুদ্দিন আল-ফিরোজাবাদি।

​একই সঙ্গে তিনি রচনা করেছেন কালজয়ী সব গ্রন্থ। তাঁর লেখা ‘জাদুল মাআদ’, ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন’, ‘মাদারিজুস সালিকিন’, ‘আদ-দা ওয়া আদ-দাওয়া’ (রোগ ও প্রতিকার) এবং ‘কিতাবুর রূহ’ আজ অব্দি মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পঠিত বইয়ের তালিকায় রয়েছে।

​সাহিত্যের আঙিনায় ও কাব্যের ভুবনে

​ইসলামী শরিয়াহর পাশাপাশি আরবি সাহিত্যেও তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি একজন উচ্চমানের কবি ছিলেন এবং তাঁর কবিতায় তাত্ত্বিক বিষয়ের মাঝেও অনন্য নান্দনিকতা প্রকাশ পেত। সমকালীন বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর জবাব দিতে গিয়ে তিনি ‘নূনিয়া’ নামে প্রায় ৬ হাজার লাইনের এক বিশাল কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়া সাহাবিদের জীবন ও আল্লাহর প্রতি প্রেমের গভীরতা নিয়ে লেখা তাঁর ‘মিমিয়া’ কবিতাটি মুসলিম সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

​আলেমদের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন ও শেষ বিদায়

​ইবনুল কাইয়িমের চিন্তাধারা নিয়ে সমকালীন আলেম সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বুরহানুদ্দিন আল-জুরাই তাঁর প্রশংসা করে বলেন, এই আকাশতলে ইবনুল কাইয়িমের চেয়ে বড় কোনো জ্ঞানী নেই। হাফেজ আল-মিজ্জি তাঁর জ্ঞানের গভীরতাকে ইমাম ইবনে খুজাইমার সাথে তুলনা করেন। পক্ষান্তরে, তাকিউদ্দিন আস-সুবকি এবং ইবনে হাজার আল-হাইতামির মতো ফকিহরা তাঁর এবং তাঁর শিক্ষকের কিছু আকিদাগত বিষয়ের কঠোর সমালোচনা করেন।

​দামেস্কের উমাইয়া মসজিদসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে খুতবা, শিক্ষাদান ও গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে জীবন কাটানো এই মহান মনীষী ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের (৭৫১ হিজরি) সেপ্টেম্বর মাসে ৬০ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। উমাইয়া মসজিদে স্মরণকালের বিশাল জানাজা শেষে দামেস্কের ‘বাবুস সাগির’ গোরস্তানে মায়ের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

এসআর

সম্পর্কিত খবর