জুলাই বিপ্লবে অবদান রাখা যোদ্ধাদের ওপর চড়াও না হতে সরকারের প্রতি কঠোর আহ্বান
জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যে যোদ্ধাদের ত্যাগের কারণে আপনারা আজ ক্ষমতায়, তাদের চোখ কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না এবং এক ফোঁটা রক্তও ঝরাবেন না। যদি এমনটি করা হয়, তবে তা হবে চরম নিমকহারামি। যাদের সাহসিকতা, সংগ্রাম ও রক্তে বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে এসেছে, তা ভুলে যাওয়া বা আড়াল করার চেষ্টা করবেন না।”
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রকাশিত ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংককে চিকিৎসাধীন আহতদের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, “হাসপাতালে যাদের দেখে এসেছি, তাদের অনেকের পুরো শরীর অবশ হয়ে আছে। সেখানকার চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা জীবনে আর কখনো বসে বা উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। তাদের কথা কি কেউ ভাববে না? ক্ষমতা কি আমাদের এতটাই অন্ধ ও স্বার্থপর বানিয়ে দেবে যে সব সত্য শেষ হয়ে যাবে? এটি হবে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।”
ইতিহাস সংরক্ষণের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “যারা এই ইতিহাসের প্রথম পর্ব উন্মোচনের মতো সাহসী কাজ হাতে নিয়েছেন, তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কারও পছন্দ হোক বা না হোক, যার যা অবদান তা যেন আড়াল না হয়। ইতিহাস যেন নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে কলমের নিখুঁত আঁচড়ে উঠে আসে।”
মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের তালিকার ঘাটতি তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, “৭১ সালে কোনো নির্দোষ মানুষ মারা গেলেও আমরা ব্যথিত হই। তবে আফসোস, ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা কিংবা শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি হলো না। বর্তমানে মাত্র ৬৫৬ জন শহীদ পরিবার ভাতা পায় বলে শুনেছি। অথচ আমরা লাখ লাখ শহীদের কথা বলি। এই তালিকা প্রণয়ন করা সরকারেরই দায়িত্ব ছিল। আগামীতে ২৪-এর ইতিহাসও যেন ৭১-এর মতো হারিয়ে না যায়, সেজন্য সরকারি উদ্যোগে সঠিক ইতিহাস রচনার আহ্বান জানাচ্ছি।”
রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “২৪-এর অভ্যুত্থানের আগে রাজনীতিকদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ আগস্ট এবং বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারির পর তা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখন অনেকে ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত বয়ান তৈরি করছেন।”
গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ। সেই অভিপ্রায়ের ওপর ভিত্তি করে যে গণভোট ও গণরায় হয়েছে, তাতে ৭০ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে। এখন সরকারি দল যদি তা না মানতে চায়, তবে আমরা বলব—আপনাদের অবশ্যই তা মেনে নিতে হবে।”
বিচারপ্রক্রিয়া ও স্মৃতিকথাসংক্রান্ত অগ্রগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এত হত্যাকাণ্ড, গুম, পঙ্গুত্ব ও মিথ্যা মামলার বিচারকাজ এখন থমকে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও আজ ৪ আগস্ট পর্যন্ত তার কোনো আলামত বা প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। এসব কি জুলাইয়ের স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো নিরন্তর চেষ্টা? দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই ধরনের চেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়া হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জীবন একটাই, আর সেই জীবন যেন কাপুরুষের মতো না হয়। দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে তরুণ ও বৃদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ইস্যু ভোলাতে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হলেও আমরা জনগণের দেওয়া রায়ের বাইরে যাব না এবং জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না।”
সবশেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণের অধিকার রক্ষা ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে রাজি। কিন্তু কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না। প্রয়োজনে জেল, আয়নাঘর কিংবা কবরে যেতে রাজি আছি, তবু নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরব না।”
এসআর