দেশে বিদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কমাতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সোমবার (১০ আগস্ট) সিঙ্গাপুরের প্লুমে আয়োজিত ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ রেমিট্যান্স সম্মাননা-২০২৬ সিঙ্গাপুর’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন বাংলাদেশি কর্মীকে বিদেশে যেতে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। সরকার এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
গত বছর প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুরে ‘বাংলাদেশ রেমিট্যান্স সম্মাননা’ আয়োজন করা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রবাসীদের পাশাপাশি কমিউনিটি ও বিনিয়োগে ভূমিকা রাখা ব্যক্তি ও সংগঠনকে অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সমস্যা দ্রুত সমাধান ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথক ‘মাইগ্রেশন উইং’ চালু করা হয়েছে। একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে এ উইং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভোকেশনাল শিক্ষা এবং তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ীদের দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
তার মতে, প্রবাসীদের বিনিয়োগ দেশের তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সরকার দেশে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ এবং ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি পাঁচটি আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এগুলো হলো—
১. হুন্ডি এড়িয়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠানো।
২. সিঙ্গাপুরের আইন, নিয়মকানুন ও কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল থাকা এবং উগ্রবাদ বা বিদ্বেষ ছড়ায়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকা।
৪. বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সম্প্রীতি বজায় রাখা।
৫. প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা নিয়মিত বাড়ানো।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের তিনটি প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে ১২৫ জনকে দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করায় দেশটির মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রতিমন্ত্রী।
একই সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের প্রশংসা করেন তিনি।
এবার মোট ১৫ জন প্রবাসীকে ‘বাংলাদেশ রেমিট্যান্স সম্মাননা-২০২৬’ দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যুক্ত তিনটি এক্সচেঞ্জ হাউস মোট ৭৫ জনকে মনোনয়ন দেয়। সেখান থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচজন করে নির্বাচিত হন।
অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউস পিটিই লিমিটেডের পক্ষ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন আবদুস ছাত্তার, মোহাম্মদ ফেরদৌস হোসেন, মো. আকরাম হোসেন, এস. এম. আরিফুর রহমান ও সায়মা আক্তার।
প্রাইম এক্সচেঞ্জ কোং পিটিই লিমিটেডের সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান, শহীদুল ইসলাম, খোরশেদ আলম চৌধুরী, মো. সালেহ জোহা ও রিয়াদ সরকার।
এনবিএল মানি ট্রান্সফার পিটিই লিমিটেডের পক্ষ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন মো. রেজাউল করিম, নাজমুল আরেফিন, মো. ওমর ফারুক সবুজ, মো. বাবুল ও মোহাম্মদ জামিউল ইসলাম।
রেমিট্যান্স পাঠানোর পাশাপাশি কমিউনিটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর সম্পর্ক জোরদারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চারটি সংগঠন ও দুজন সিআইপিকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননা পাওয়া সংগঠনগুলো হলো বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার সিঙ্গাপুর (বিবিসিএস), সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটি (এসবিএস), মাইগ্রেন্ট মিউচুয়াল এইড এবং দ্য ওয়ান্ডারিং দরবেশ।
সিআইপি সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামান এবং শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী মাইন উদ্দিন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, ওয়ান ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান এ. এস. এম. শহীদুল্লাহ খান, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও আইবিএর অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিন, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান এবং থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক বাসব বাগচিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো, প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এসআর