দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
সয়াবিন তেল, চিনি এবং বিভিন্ন ধরনের দুধের ওপর পরিচালিত তিনটি পৃথক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যের সঙ্গে অজান্তেই মানুষের শরীরে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে সব নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়।
প্রতি লিটার তেলে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা তেলে দূষণের মাত্রা বেশি ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, খোলা তেলের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও বিক্রির অনিয়ম, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাত্র এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ দূষণের প্রভাব থাকতে পারে। আর বোতলজাত তেলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের বিভিন্ন ধাপকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
একই সময়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ও খোলা চিনির নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরীক্ষিত প্রায় ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। খোলা চিনিতে এ দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
এদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কাঁচা দুধ, তরল দুধ, গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপেই এসব কণা খাদ্যে যুক্ত হচ্ছে।
তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, পিভিসি, নাইলন, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে আঁশ বা ফাইবারজাতীয় কণা, যা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যে মিশতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুধের ব্যবহার বেশি হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে বলেও গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
যদিও গবেষণাগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিককে কোনো নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি কারণ বলা হয়নি, তবে দীর্ঘদিন শরীরে এসব কণা জমে থাকলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষকদের মত।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সমস্যা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদের মতে, অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করলে রক্তনালী, পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া কিছু প্লাস্টিকজাত রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রজননস্বাস্থ্য ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এসআর