ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজধানী ঢাকা বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা—এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। রাজধানীর কাছাকাছি মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডাউকি ফল্ট দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না করায় এসব এলাকায় চাপ জমে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় অনুভূত মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট কম্পনকে বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস বলা যায় না, তবে এগুলো ভূগর্ভস্থ ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার ইঙ্গিত হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার অনেক এলাকা জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠায় সেখানে নরম মাটি রয়েছে। শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে এ ধরনের এলাকায় ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটি তরলের মতো আচরণ করার ঝুঁকি থাকে, যা ভবনের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই আগাম প্রস্তুতি, নিরাপদ ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ হয় ভবন ধসে পড়া, তাই নির্মাণমান নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। বিভিন্ন ঝুঁকি মূল্যায়নে দেখা গেছে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে দুর্বল নির্মাণের বহু ভবন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাই ভবনের নকশা, নির্মাণমান ও নিরাপত্তা নিয়মিত যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হলো জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ, বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, সরু সড়ক, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কারের অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের ঝুঁকি এবং উদ্ধার সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা।
তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, নতুন ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগণকে ভূমিকম্প বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, নিরাপদ অবকাঠামো এবং কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এসআর