বর্ষা মৌসুম এলেই ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য বৃষ্টি আশীর্বাদের চেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে
দাঁড়ায়। মাত্র এক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই মিরপুর, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী কিংবা মান্ডার মতো রাজধানীর বহু সড়ক ও এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে চরম দুর্ভোগে ফেলে।
প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ও পরিকল্পনা সত্ত্বেও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ও জলাভূমি দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ জলাবদ্ধতা নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাল পুনরুদ্ধারে ব্যয় করা হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টিসহ মোট ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করে ড্রেন সংস্কার, কালভার্ট মেরামত ও পাম্পিং সুবিধা বৃদ্ধির কাজ চালানো হচ্ছে।
বর্তমানে পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত মান্ডা, জিরানি, শ্যামপুর, বেগুনবাড়ী ও কালুনগর খালের সংস্কারসহ পুরোনো বক্স কালভার্ট অপসারণ করে প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাল খনন করলেই হবে না, ড্রেন ও খালে প্লাস্টিকসহ গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে বছরব্যাপী কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
এক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর মডেল অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে; যেমন জাপানের টোকিওর মতো বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার ও টানেল নির্মাণ, সিঙ্গাপুরের মতো রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ও রিয়েল-টাইম ডিজিটাল মনিটরিং এবং চীনের ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণার মতো পানি শোষণক্ষম রাস্তা ও সবুজ অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—খাল ও জলাশয় সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, নিচু এলাকায় নতুন পাম্পিং স্টেশন স্থাপন এবং ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রাজউকের মতো সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের জন্য একটি একীভূত নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
চলমান প্রকল্পগুলো সফল হলে স্বল্প ও মাঝারি বৃষ্টিতে দুর্ভোগ কমলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম আবহাওয়া মোকাবিলা করতে হলে কেবল অবকাঠামো নয়, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর বাস্তবায়নই ঢাকাবাসীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে।
এসআর