অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করা সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং যুব-১ শাখার উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখতে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন ও উপসহকারী পরিচালক রোমান উদ্দিন।
দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তরে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন পেয়েছেন, তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথি এবং এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধিবিধান ও সহায়ক কাগজপত্রও চাওয়া হয়েছে।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চাওয়া তথ্য ও নথিপত্র দুদকের অনুসন্ধান দলের কাছে পাঠাতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৭ মে ও ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের দুটি স্মারকের ভিত্তিতে বদলিসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত কপি চেয়েছে দুদক। পাশাপাশি তিনটি পৃথক স্মারকের আওতায় ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব প্রদান, তা বাতিল এবং পরবর্তী পদায়নের নথিও তলব করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিও চেয়েছে দুদক।
তালিকায় ঢাকার গোলাম মোস্তফা, মামুন, জাহিদ ও আমির; বগুড়ার আনিচ, জাহিদ ও ইব্রাহীম; বরিশালের জুলহাস; পাবনার নকিমউদ্দিন, আলী হোসেন ও আবু সাঈদ; ধামরাইয়ের কোরবান আলী এবং নরসিংদীর আলী হোসেন রয়েছেন।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন ও পদোন্নতি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন করে পদায়নের ক্ষেত্রে মোট ৭৬ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে প্রত্যেক কর্মকর্তার কাছ থেকে গড়ে প্রায় দুই লাখ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পদোন্নতির জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য আরও দুই কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
এসব অভিযোগ মিলিয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নকেন্দ্রিক অর্থ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বদলি-পদোন্নতির পাশাপাশি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে দুদক।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র তৈরি করা হয়েছিল।
ওই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডার, কেনাকাটা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ও দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
এদিকে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ পাচার, বিটকয়েন লেনদেন, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রভাব বিস্তারের মতো আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকাকালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে।
অভিযোগের এসব বিষয়ে সাবেক উপদেষ্টার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, পদোন্নতি, বদলি, পদায়নসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসআর