UNCCD COP17-এ এজেন্ডা থেকে নারী, নাগরিক সমাজ ও তিন রিও কনভেনশনের সমন্বয় বাদ দেওয়ায় উদ্বেগ ‘মাঠপর্যায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলার উদ্যোগ সফল হবে না’—নাগরিক সমাজ।
উলানবাটর, মঙ্গোলিয়া, ১৭ আগস্ট ২০২৬: জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের (UNCCD) ১৭তম সম্মেলন—COP17-এর শুরুতেই এজেন্ডা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সম্মেলনের এজেন্ডা গ্রহণের সময় লিঙ্গসমতা, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং তিনটি রিও কনভেনশনের মধ্যে সমন্বয় (synergies)-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাদ দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে UNCCD-এর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো।
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে UNCCD COP17। এবারের সম্মেলনকে ভূমি পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলা ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের সম্মেলন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, যাঁরা মাঠপর্যায়ে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ, খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করছেন, তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া সম্মেলনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা কঠিন।
COP17-এর উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাজের সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে UNCCD Civil Society Organization (CSO) Panel। প্যানেলটি UNCCD-এর পাঁচটি অঞ্চলের স্বীকৃত পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আদিবাসী জনগণ, কৃষক, পশুপালক, নারী, তরুণ, গবেষক ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ ও খরার সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। ফলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় তাঁদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান ও বাস্তবসম্মত সমাধানকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের আলোচনায় জায়গা দেওয়া জরুরি।
নাগরিক সমাজের অভিযোগ, COP17-এর এজেন্ডা গ্রহণের সময় নারীর অংশগ্রহণ ও লিঙ্গসমতা, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং তিন রিও কনভেনশনের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আলোচনার বিষয়গুলো রাখা হয়নি।
রিও কনভেনশন বলতে মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য এবং মরুকরণ ও ভূমি অবক্ষয় মোকাবিলাসংক্রান্ত জাতিসংঘের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশনকে বোঝানো হয়। নাগরিক সমাজের মতে, এই তিন ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই একটি ক্ষেত্রের নীতিকে অন্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা করে দেখলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন হতে পারে।
CSO Panel বলেছে, এসব বিষয় আলোচনার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি সম্মেলনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের জন্যও উদ্বেগের কারণ।
‘মাঠের মানুষের জ্ঞানকে বাদ দিলে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়’ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, মরুকরণ, ভূমি অবক্ষয় ও খরার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। অনেক ক্ষেত্রে এসব জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানের মাধ্যমে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার নানা পদ্ধতি তৈরি করেছে।
কৃষক, পশুপালক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী ও তরুণদের তাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখলে হবে না; তাঁদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার করতে হবে।
CSO Panel-এর বক্তব্য, ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলোর সরাসরি যোগাযোগ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের ভাষায়, একটি সংগঠন, একজন বিজ্ঞানী, একজন আলোচক বা একটি দেশ একা এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি মোকাবিলা করতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর অংশীদারত্ব ও সম্মিলিত উদ্যোগ।
‘নাগরিক সমাজকে বাদ দেওয়া জাতিসংঘের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, মরুকরণ, খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলো। একই সঙ্গে এসব সমস্যা মোকাবিলায় তাদের কাছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবসম্মত অনেক সমাধানও রয়েছে।
তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে তাদের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়া হলে তা শুধু নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের জন্যই ক্ষতিকর হবে না, বরং মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নেও বাধা সৃষ্টি করবে।
CSO Panel বলেছে, নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো নীতিনির্ধারকদের প্রতিপক্ষ নয়। বরং তারা এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে চায়, যা মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
তাদের বক্তব্য, জাতিসংঘের যে অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়, তার সঙ্গে নাগরিক সমাজকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রাখার প্রবণতা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এজেন্ডা পুনর্বহালের আহ্বান
COP17-এর অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার ও আলোচকদের প্রতি এজেন্ডায় বাদ পড়া তিনটি বিষয় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে CSO Panel।
তারা বিশেষভাবে লিঙ্গসমতা, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং তিন রিও কনভেনশনের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আলোচনা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, COP17 যদি সত্যিই বাস্তবায়ন ও কার্যকর পদক্ষেপের সম্মেলন হতে চায়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে মাঠপর্যায়ের মানুষের কণ্ঠস্বরকে জায়গা দিতে হবে।
এবারের COP17-এ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরতে তিনটি পৃথক সংবাদ সম্মেলন করবেন। আয়োজকদের দাবি, UNCCD-এর কোনো COP-এ এবারই প্রথম স্বীকৃত পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর জন্য এ ধরনের তিনটি পৃথক সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে। উদ্বোধনী এই সংবাদ সম্মেলনে COP17 শুরুর প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজের অগ্রাধিকার, গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন হবে ২১ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে। সেখানে আলোচনায় আসবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অংশগ্রহণ, অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা এবং চলমান আলোচনায় নাগরিক সমাজের অবস্থান।
শেষ সংবাদ সম্মেলন হবে ২৭ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে। সেখানে COP17-এর আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হয়েছে, কোন চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে এবং সম্মেলন শেষে সামনে কী করণীয়—এসব বিষয়ে নাগরিক সমাজের মূল্যায়ন তুলে ধরা হবে।
উলানবাটরে COP17-এর আলোচনা আগামী ২৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ভূমি পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলা, চারণভূমি, টেকসই কৃষি, মাটি, অর্থায়ন ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবারের সম্মেলনের আলোচনায় রয়েছে।
এর মধ্যে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এজেন্ডা নিয়ে এই আপত্তি সম্মেলনের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ ভূমি অবক্ষয় ও খরার প্রভাব শুধু নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন এর সরাসরি প্রভাব মোকাবিলা করছে।
তাই COP17-এর মূল লক্ষ্য যদি বাস্তবে ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে সেই উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী, তরুণ, কৃষক, পশুপালক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা যায়—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এসআর