[email protected] বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
৩ আষাঢ় ১৪৩৩

‘শিশুরা কখনোই যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না’: গুতেরেস

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬ ৫:২৫ পিএম

সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা বন্ধে বিশ্বনেতাদের প্রতি গুতেরেসের কঠোর আহ্বান।

বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক বিয়ে, অপহরণ, মানব পাচার কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীতে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তি—এসব অপরাধের সবচেয়ে অসহায় শিকার হয়ে উঠছে শিশুরা। এই পরিস্থিতিকে মানবতার জন্য গভীর লজ্জা ও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা বন্ধে বিশ্বনেতা, রাষ্ট্র এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

আগামী ১৯ জুন পালিত হতে যাওয়া ‘সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নির্মূল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাতের বিস্তার এবং যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অপরাধ অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে ভয় সৃষ্টি, সামাজিক কাঠামো ধ্বংস এবং জনগোষ্ঠীকে দুর্বল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গুতেরেস বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতার সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় পরিশোধ করতে হয় শিশুদের। তারা এমন অপরাধের শিকার হচ্ছে, যার ক্ষত শুধু শরীরে নয়, সারাজীবনের জন্য তাদের মনোজগতেও গভীর দাগ কেটে যায়।

সংঘাতের মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিশু নিজেদের ঘরবাড়িতে হামলার সময় যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আবার কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যাওয়ার পথে নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছে। অনেক শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে অপহরণ করা হচ্ছে। তাদের জোরপূর্বক সশস্ত্র গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে কিংবা যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক শিশুকে এমন ভয়াবহ সহিংসতা প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য করা হয়, যা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুদের নিজেদেরও সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তারা নানা ধরনের ট্রমা, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার শিকার শিশুদের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরে আসতে কঠিন বাধার মুখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সমাজের বৈষম্য ও কলঙ্কেরও শিকার হয়।

‘এটি শুধু অপরাধ নয়, একটি যুদ্ধের কুচক্রশল’ আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা অনেক সময় যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর লক্ষ্য থাকে কোনো সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করা, সামাজিক বন্ধন ভেঙে দেওয়া এবং জনগণের মনোবল ধ্বংস করা।

তার ভাষায়, “এই ধরনের সহিংসতা শুধু একজন শিশুর ওপর আঘাত নয়; এটি পুরো একটি পরিবার, সম্প্রদায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আঘাত।”

তিনি বলেন, সংঘাত শেষ হয়ে গেলেও এসব নির্যাতনের ক্ষত বহু বছর ধরে রয়ে যায়। ভুক্তভোগী শিশুদের অনেকেই শারীরিক জটিলতা, মানসিক আঘাত, সামাজিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়।

তিনটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

প্রথমত, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা থেকে রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। গুতেরেস বলেন, দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই অপরাধ কখনোই কমবে না। তাই ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।

তৃতীয়ত, সহিংসতার মূল কারণগুলো দূর করতে হবে। সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

শুধু উদ্ধার নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, নির্যাতনের শিকার শিশুদের শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা দিলেই হবে না। তাদের শারীরিক চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী শিশুদের অনেকেই ভয়, লজ্জা এবং সামাজিক কলঙ্কের কারণে দীর্ঘদিন নীরব থাকে। তাই তাদের জন্য এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা ভয় ছাড়াই সহায়তা চাইতে পারে।

একই সঙ্গে পরিবারগুলোকেও সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কারণ, একটি শিশুর পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘এটি আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব’ বিশ্বের সব রাষ্ট্র এবং সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে গুতেরেস বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।

তিনি বলেন, “শিশুরা কখনোই যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। তাদের সুরক্ষা দেওয়া শুধু একটি নীতিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।”

জাতিসংঘ মহাসচিবের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও অসংখ্য শিশু যুদ্ধ, সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে তাদের শৈশব হারাচ্ছে। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে শুধু বিবৃতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ।

বার্তার শেষ অংশে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার নিয়ে বড় হতে পারবে। কোনো শিশুকেই যেন যুদ্ধের মূল্য নিজের জীবন ও শৈশব দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর