বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত বসতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নগরজীবনকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি ইউএন-হ্যাবিট্যাটের ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩৪০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত আবাসন, নিরাপদ বসবাসের অধিকার, মৌলিক পরিষেবা কিংবা সাশ্রয়ী জীবনযাপনের সুযোগের ঘাটতিতে রয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে একশ কোটির বেশি মানুষ বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করেন।
এ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান নগর এলাকার উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘ।
আগামী ৩১ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব নগর দিবস (ওয়ার্ল্ড সিটিজ ডে)।
২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘নগরের পুনর্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ (Regenerating the City: Adequate Housing for All)।
এ উপলক্ষে বৈশ্বিক মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের ফুঝৌ শহরে। জাতিসংঘের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে বিভিন্ন আলোচনা, প্রদর্শনী ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আয়োজন থাকবে।
আবাসন সংকটের ব্যাপ্তি:
আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; মানুষের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাসস্থান কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও গণপরিবহনের কাছাকাছি হলে মানুষের সময় ও যাতায়াত ব্যয় কমে। বিপরীতে, অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর বসতিতে বসবাসকারীরা রোগব্যাধি, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
ইউএন-হ্যাবিট্যাটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে পর্যাপ্ত আবাসনের ঘাটতি কয়েক দশকের বিনিয়োগস্বল্পতা, দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিরাপদ বাসস্থানের পাশাপাশি জমি বা বসতিতে স্থায়ী অধিকার, পর্যাপ্ত জায়গা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবও এ সংকটকে গভীর করছে।
নগর এলাকায় জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমি ও বাড়িভাড়ার ওপর চাপ বাড়ে। অনেক শহরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের উপার্জনের তুলনায় আবাসন ব্যয় বেশি।
ফলে কর্মস্থলের কাছাকাছি বাসা নেওয়া অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শহরের প্রান্তে কিংবা মৌলিক পরিষেবার সীমিত সুযোগসম্পন্ন এলাকায় বসতি গড়েন।
কী এই নগর পুনর্জীবন?
নগর পুনর্জীবন বলতে শুধু পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে জরাজীর্ণ ও অবহেলিত এলাকার উন্নয়ন, আবাসনব্যবস্থা সংস্কার, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি, নিরাপদ সড়ক ও গণপরিবহন, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকা সৃষ্টি এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা।
এবারের প্রতিপাদ্যে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সাশ্রয়ী আবাসন ও অনানুষ্ঠানিক বসতি উন্নয়নের সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্য হলো এমন পাড়া ও মহল্লা গড়ে তোলা, যেখানে বিভিন্ন আয়ের মানুষ বসবাস করতে পারবেন এবং বন্যা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহের মতো ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা থাকবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আগে সেখানে বসবাসকারী মানুষের প্রয়োজন, জীবন-জীবিকা, জমি ও বসতিসংক্রান্ত অধিকার এবং আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
উন্নয়নের নামে যেন পুরোনো বাসিন্দারা উচ্ছেদের শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থাও প্রয়োজন।
নগরবিদদের দৃষ্টিতে আবাসন:
বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন ও আবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
নগরায়ণ ও আবাসনসংক্রান্ত আলোচনায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের সুযোগ এবং শহরের পরিকল্পিত উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ঢাকার বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতির পরিস্থিতিও নগর পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদদের আলোচনায় সাশ্রয়ী আবাসন, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং নাগরিক সুবিধার সুষম বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, উপযুক্ত জমির ব্যবস্থা এবং কর্মস্থলের সঙ্গে আবাসনের সংযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিমত ও গবেষণার মূল বক্তব্য হলো, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন চাহিদা পূরণ এবং নাগরিক সুবিধার ন্যায্য বণ্টনও নগর উন্নয়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
তবে নির্দিষ্ট নগরবিদের বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃত করতে হলে তাঁর প্রকাশিত সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা বা গবেষণার নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার করা জরুরি।
বাংলাদেশের নগরায়ণে বড় চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব নগর দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে আবাসনের ব্যয়, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ, সবুজ জায়গার সংকট এবং পরিকল্পিত নগরসেবার অসম প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এ দেশের নগর এলাকার জনসংখ্যা, আবাসন এবং বস্তিসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসব সরকারি তথ্য নগরায়ণ ও আবাসন পরিস্থিতি বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
রাজধানীতে কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ বসবাস করলেও তাঁদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন।
অন্যদিকে, অপরিকল্পিত নির্মাণ, জলাধার ও খোলা জায়গার সংকোচন এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার অভাব পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আবাসন পরিকল্পনার সঙ্গে গণপরিবহন, কর্মসংস্থান, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনকে সমন্বিত করা প্রয়োজন।
শুধু নতুন আবাসন নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও গণপরিবহনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়ন যেন উচ্ছেদের কারণ না হয়:
নগর উন্নয়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নত অবকাঠামো ও আবাসন তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান বাসিন্দাদের অধিকার সুরক্ষা করা।
নতুন সড়ক, বাণিজ্যিক ভবন কিংবা আবাসন প্রকল্পের কারণে জমি ও বাড়িভাড়া বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের মানুষ অনেক সময় নিজেদের এলাকায় বসবাসের সামর্থ্য হারাতে পারেন।
ফলে একটি এলাকা বাহ্যিকভাবে উন্নত হলেও সেখানকার পুরোনো বাসিন্দারা উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে নগর পুনর্জীবন পরিকল্পনায় সাশ্রয়ী আবাসন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, ভূমি-অধিকার সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতিতে উচ্ছেদকে একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা না করে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, চলাচলের পথ ও দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
টেকসই নগর গড়তে নতুন নীতি:
বাংলাদেশের নগর উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ হলো জাতীয় নগর নীতি ২০২৫। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নীতিটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত হয়েছে।
এতে পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন নীতির লক্ষ্যগুলো বাস্তবে কার্যকর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১ নম্বর লক্ষ্য হলো শহর ও জনবসতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, দুর্যোগ-সহনশীল ও টেকসই করে গড়ে তোলা।
এ লক্ষ্য অর্জনে সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ গণপরিবহন, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নগরসেবায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব নগর দিবস সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। এবারের প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয়, শহরের উন্নয়নকে শুধু ভবন, সড়ক ও অবকাঠামোর সম্প্রসারণ দিয়ে বিচার করা যায় না।
উন্নয়নের প্রকৃত সুফল নির্ভর করে মানুষ কতটা নিরাপদে, সাশ্রয়ে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন, তার ওপর।
তাই বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল শহর গড়ে তুলতে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষকে এবং নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের সুযোগ।
এসআর