[email protected] মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

রাজউকের অফিস সহকারী দম্পতির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬ ৫:২৩ পিএম

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুই অফিস সহকারী—অর্থ ও নিরীক্ষা শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফারহানা সিদ্দিকা এবং জোন-৮-এর অফিস সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন (আলম)

ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, তদবির বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সাধারণ সরকারি চাকরি করলেও তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরির ৩ কাঠার একটি প্লট (আইডি নং-২০-৩০১-০০৪)-এর দখল বুঝে নিতে রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেন ফারহানা সিদ্দিকা। আবেদনে স্বামী হিসেবে মো. আনোয়ার হোসেনের নাম ও যাত্রাবাড়ীর ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও দুজনই যে রাজউকের কর্মচারী, সেই তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ফারহানা সিদ্দিকা দাবি করেন, তিনি মূল বরাদ্দগ্রহীতা আব্দুল জব্বার মীরের আম-মোক্তার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধ শেষে দখল বুঝে নিতে আবেদন করেছেন। পরে প্লটটি তার স্বামীর নামে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে বরাদ্দগ্রহীতার পরিবর্তে স্বামীর নামে হস্তান্তরের কারণ জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

 

সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট দুদকের উপ-পরিচালক জেসমিন আক্তার রাজউকের ১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে প্রয়োজনীয় নথি চেয়ে আবেদন করেন। ওই তালিকার পাঁচ ও ছয় নম্বরে ছিল আনোয়ার হোসেন (আলম) ও ফারহানা সিদ্দিকার নাম। তবে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর মিথিলা ফারজানা নামে এক নারী রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এস্টেট-০১ শাখায় কর্মরত এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তন্ময় সরকার নামে এক বহিরাগত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে দাপ্তরিক কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তন্ময় সরকার অতীতে রাজউকের মোবাইল কোর্টে আটক হয়েছিলেন এবং বর্তমানে নিজেকে রাজউকের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, তন্ময় সরকার আনোয়ার হোসেন (আলম)-এর ভাগিনা।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করলেও আলম-ফারহানা দম্পতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, দোকান ও জমির মালিক হয়েছেন। তাদের সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটিরও বেশি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কার্যকর তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

মিথিলা ফারজানার সর্বশেষ অভিযোগে আরও বলা হয়, আনোয়ার হোসেন (আলম) নিয়মিত নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে তদবিরে ব্যস্ত থাকেন। হাজিরা খাতায় অন্যের মাধ্যমে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগও করা হয়েছে। এছাড়া চাকরিতে যোগদানের সময় নিজ জেলার পরিচয় গোপন করা, পূর্বাচলে প্লট দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, পল্লবী থানার একটি মামলার আসামি হওয়া এবং অবৈধ ডলার বহনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার দাবিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাজনাবাড়ি এলাকায় আলম তার ছেলের নামে 'বাইতুর রাইয়ান নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা' প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্থানীয়দের অনেকেই তাকে রাজউকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে জানেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, দামী গাড়িতে চলাফেরা, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অনুদান এবং জমি কেনাবেচায় সক্রিয় থাকার কারণে এলাকায় তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও প্লট সংক্রান্ত তথ্যকে কেন্দ্র করে আনোয়ার হোসেন (আলম) একটি শক্তিশালী তদবির চক্র গড়ে তুলেছেন। তাদের দাবি, এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি।

 

অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার হোসেন (আলম) বলেন, যাত্রাবাড়ীতে একটি ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি এবং উত্তরায় সাড়ে তিন কাঠার একটি জমি ছাড়া তাদের আর কোনো সম্পদ নেই। তিনি দাবি করেন, তিনি ও তার স্ত্রী দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজউকে চাকরি করছেন এবং ২০০৬ সালে জমি ও ২০১০ সালে ফ্ল্যাট কিনেছেন। সব সম্পদের তথ্য আয়কর নথিতে রয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে রানাভোলা এলাকায় বাড়ি নির্মাণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কিংবা ফারহানা সিদ্দিকার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসআর

সম্পর্কিত খবর