দীর্ঘ ১৬ বছর পর নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের সম্ভাবনায় নতুন আশার আলো দেখছে রাজধানীর অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা।
জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি ভারপ্রাপ্ত ও অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।
ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কেবল তাই নয় নিয়মিত অধ্যক্ষ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি বানিজ্য, অবৈধ শিক্ষক নিয়োগসহ নানা অনিয়ম হয়েছে দেদারসে।
বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান থেকে লোপাট করা হয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। অভিভাবকদের দাবি, দীর্ঘদিন নিয়মিত অধ্যক্ষ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে এবং শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) উদ্যোগে সম্প্রতি অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের শূন্যতা দূর হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকা শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
রফিকুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার সুশৃঙ্খল পরিবেশ, শিক্ষার মান এবং হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে সক্ষম হবে।
অভিভাবক ও শিক্ষক সূত্রে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের সময়ে পরপর দুই দফা অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দুই কমিটির মধ্যবর্তী প্রায় দুই মাস প্রতিষ্ঠানটি কোনো কার্যকর কমিটি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে ১১ জন শিক্ষককে স্থায়ীকরণ, কয়েকজন পার্ট-টাইম শিক্ষক নিয়োগ এবং ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অ্যাডহক কমিটির সীমিত ক্ষমতার মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে গত মাসে তথ্য গোপন করে তিন জন শিক্ষককে এমপি ভুক্ত করার জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম পর পর দুইবার অনলাইনে আবেদন করেন, দুই বার ই রিজেক্ট হয়।
তৃতীয়বারের মতো আবারও অনলাইনে এমপি ও ভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে। এমপিও ভুক্তির জন্য আবেদনে কোন মিথ্যে তথ্য দেওয়া হলে তার দায় অধ্যক্ষের উপরে বর্তায়।
অন্যদিকে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গভর্নিং বডি নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হলেও ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকদের একটি অংশ।
জানা গেছে, বর্তমান অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ আগামী ১৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কমিটির সভাপতি হিসেবে পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন ইসমাইল জবিউল্লাহ।
এ পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের একটি অংশ দ্রুত গভর্নিং বডি নির্বাচন আয়োজন এবং নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নির্বাচিত গভর্নিং বডি এবং নিয়মিত অধ্যক্ষের বিকল্প নেই।
এছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম, কয়েকজন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ মহলের সমর্থন নিয়ে আওয়ামী দোসর হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। একই সঙ্গে সাবেক এপিএস মীর সোলাইমান, অধ্যক্ষ এবং কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাসদা বেগম সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জামাল উদ্দিন মোঃ আকবর বাবলা এর স্ত্রী এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে। তার নিয়োগ অবৈধ তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নিয়োগ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে ভিকারুননিসায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষার পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে দ্রুত ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ ও মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজে ইতোমধ্যে শিক্ষা ক্যাডার থেকে এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রেষণে অধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়েছেন।
এসআর