সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব, ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগেুলো তালিকাভুক্তির দাবি করেন বাংলাদেশের জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ থেকে জাপানে উচ্চশিক্ষার্থী ও দক্ষ মানবসম্পদ প্রেরণের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াকে সহজতর করা এবং সম্ভাবনাময় জাপানি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্

বুধবার রাজধানীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভার বিষয় ছিল— ‘জাপানে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী ও দক্ষ মানবসম্পদ প্রেরণে জাপানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সম্ভাবনা’।
সভায় জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বাস্তবতা, দেশটির শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান জনবল সংকট, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ, দক্ষ কর্মী নিয়োগ নীতি এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জাপানে জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় দেশটি বর্তমানে বিদেশি দক্ষ কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, কৃষি, আতিথেয়তা এবং সেবাখাতে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, মন্ত্রণালয়ের জাপান সেলের প্রধান (যুগ্মসচিব) মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এছাড়া ব্যাংকিং খাত, শিক্ষা খাত, মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র এবং জাপান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সভায় নীতি-নির্ধারক, ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধি এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সামনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। এসব প্রস্তাবনার মধ্যে ছিল— জাপানমুখী শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য সহজ শর্তে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ঋণ, ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন, ভিসা ও ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার করা এবং জাপানি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ।
সভায় বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে জাপানি ভাষা শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা পরামর্শ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করে আসা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ জাপানিজ ভাষা শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ স্টূডেন্ট সাপোর্ট এসোসিয়েশ্যান (BSSAJ) এবং এসোসিয়েশ্যান অফ জাপান ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটস বাংলাদেশ (AJLIB)-এর নেতৃবৃন্দ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরেন।
সভায় দেশের জাপানমুখী শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— Dhaka Nihongo Academy,Japan Education & Job Center, Top Link Education, Modern Education Center, Basic Japanese Language School, JB Kokosai, Nippon Education Centre, Ichiban Study Link, Japan Bangladesh Foundation এবং Sun Japanese Training Center-এর চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা। এছাড়াও জাপানি ভাষা শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা পরামর্শ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশের আরও বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। তারা জাপানে শিক্ষার্থী ও দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা, ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
তারা বলেন, জাপানে শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষাগত প্রস্তুতি, আর্থিক সক্ষমতা, ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা এবং তথ্যের ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে পরিচালিত জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি তালিকাভুক্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা। তাদের মতে, সরকার স্বীকৃত একটি তালিকা প্রণয়ন করলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সহজেই মানসম্মত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে পারবেন এবং বিদেশগামীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি হবে।
সভায় অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা আরও বলেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী জাপানে যাওয়ার আগ্রহ দেখালেও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সমন্বিত সহায়তার অভাবে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সরকার, ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং জাপান-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।
সভায় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী এবং বাংলাদেশ দূতাবাস, টোকিওর কাউন্সেলর (শ্রম) জয়নাল আবেদীন। তারা জাপানের বর্তমান শ্রমবাজার, শিক্ষাখাতের সুযোগ, বিদেশি কর্মী নিয়োগের নীতিমালা এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য বিদ্যমান সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তারা জানান, জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাষাগত দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা এবং পেশাগত যোগ্যতা উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য জাপানের দরজা উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সভায় বক্তারা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, জাপান বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার গন্তব্যগুলোর একটি। তাই পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, মানসম্মত ভাষা শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ব্যাংকিং খাত এবং জাপান-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে জাপানে দক্ষ মানবসম্পদ ও শিক্ষার্থী প্রেরণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স আয় এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসআর