[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩

ঋণ সংকট, বাণিজ্য বাধা ও সংঘাতে নাজুক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা: আন্তোনিও গুতেরেস

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০২৬ ৩:১৭ পিএম

প্রতীকী ছবি

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপে বৈশ্বিক এমএসএমই খাত; শান্তি ও বিনিয়োগে জোর জাতিসংঘের।

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (Micro, Small and Medium-sized Enterprises—MSMEs) খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। চলমান সংঘাত, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের কোটি কোটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে এমএসএমই খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

আগামী ২৭ জুন পালিতব্য ‘মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম-সাইজড এন্টারপ্রাইজেস ডে’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তিই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই খাতের অন্তর্ভুক্ত এবং বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে এমএসএমই।

জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, মহানগর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও তরুণদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান অপরিসীম। একই সঙ্গে উদ্ভাবনী চিন্তা ও নতুন সমাধানের মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এ খাত।

গুতেরেস তার বাণীতে বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর ওপর। জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় তারা দ্রুত চাপের মুখে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রথম ধাক্কাগুলো সাধারণত এই খাতকেই বহন করতে হয়।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, বহু বছর ধরেই এমএসএমই খাত পর্যাপ্ত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। অনেক প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে উদীয়মান প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ।

তিনি উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ব্যবসার ধরন বদলে দিচ্ছে। যারা প্রযুক্তিগত অভিযোজন করতে পারবে না, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলছে।

গুতেরেসের মতে, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা এমএসএমই খাতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি। কিন্তু অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন। ফলে এই শ্রেণির উদ্যোক্তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো জরুরি।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে যুব বেকারত্ব কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে এমএসএমই খাতকে দেখা হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বৈশ্বিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অন্যতম প্রধান অবদান রাখছে।

চারটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব এমএসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দেন।

প্রথমত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ছোট ব্যবসাগুলোও স্বল্প খরচে প্রয়োজনীয় মূলধন পেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় রপ্তানি বাজার ও কাঁচামালের উৎস বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। এতে করে একটি অঞ্চল বা উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

চতুর্থত, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পূর্ণ সুবিধা গ্রহণে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে সহায়তা করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে শান্তির প্রশ্নটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যকর রাখতে হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। সংঘাত ও যুদ্ধের পরিবেশে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাণীর শেষাংশে গুতেরেস বলেন, টেকসই উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান বাহন হচ্ছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প। তাই এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর