চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান গত বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালতে এ আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি ডনকে ‘কৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির’ বলে উল্লেখ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ মামলায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম জানান, ডনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ২৭ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।
সিআইডির আবেদনে রিমান্ডের পক্ষে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হওয়া এবং সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে আসার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংস্থার দাবি, ডনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া বিদেশে যাওয়ার চেষ্টার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনতে চায় সিআইডি। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এবং কার সহযোগিতা বা প্ররোচনায় তিনি দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য জানার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট তার জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম গত বছরের ২০ অক্টোবর হত্যা মামলাটি করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পরিকল্পিতভাবে যোগসাজশের মাধ্যমে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়।
এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তিনি দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর থেকেই এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে তিনি ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই করা ওই আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ঘটনা ও হত্যার অভিযোগ—দুই দিক থেকেই তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।
একই বছরের ৩ নভেম্বর তদন্ত শেষে সিআইডি প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদন মেনে না নিয়ে তার বাবা রিভিশন মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে সালমান শাহর বাবা মারা গেলে মামলাটি এগিয়ে নেন তার মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহের কথা জানান।
এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব)। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
এসআর