[email protected] শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩

ডিআইএতে আব্দুস সালামের পদায়ন ঘিরে বিতর্ক!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২০ এএম

সংগৃহীত ছবি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে (ডিআইএ) যুগ্ম পরিচালক পদে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা আব্দুস সালাম আজাদের পদায়ন ঘিরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

২১তম বিসিএসের এই কর্মকর্তাকে গত ১ সেপ্টেম্বর ডিআইএর যুগ্ম পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়।

তবে বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত আদেশ প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তিনি ডিআইএতে যোগদান করতে পারেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার পদায়ন নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, আগে তাকে যোগদান করানোর পর পদায়নের আদেশ ওয়েবসাইটে প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পদায়নসংক্রান্ত আদেশে তাকে আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) থেকে অবমুক্ত হতে বলা হয়েছে। তবে বিতর্কের মধ্যে তিনি দ্রুত যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, পদায়ন নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদেশটি বাতিলও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

অতীতের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

আব্দুস সালাম আজাদের ব্যক্তিগত নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে তিনি ডিআইএর পরিদর্শক হিসেবে পদায়ন পান এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের সুপারিশে তিনি পদায়ন পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে সালাম আজাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ২০১৩ সালে ডিআইএতে পদায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোনো মন্ত্রীর সুপারিশ নেননি।

ডিআইএতে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে অর্থ গ্রহণসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এমনকি গুলশানের হলি আর্টিজান হামলা-সংক্রান্ত মামলার তদন্তে তাকে তলব করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তার ভাই আবুল কালাম আজাদও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। ব্যক্তিগত নথিতে এমন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে যে, ভাইয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সালাম আজাদ অনিয়মে জড়াতেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন অভিযোগের পর ২০১৯ সালে তাকে ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে পদায়ন করা হয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

পদায়ন নিয়ে সালাম আজাদের বক্তব্য

তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও পদায়নের আদেশ অনলাইনে প্রকাশ না হওয়ার বিষয়ে আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, পদায়নের আদেশ মন্ত্রণালয় কেন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি, সেটি তার জানা নেই। আদেশের কপি তিনি কীভাবে পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে হোয়াটসঅ্যাপে সেটি পাঠিয়েছেন।

২০১৩ সালে ডিআইএতে পদায়নের জন্য কোনো মন্ত্রীর সুপারিশ নেননি দাবি করে তিনি বলেন, তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক বিপুল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে তার রাজনৈতিক আদর্শের মিল না থাকায় তাকে সেখানে কাজ করতে দেওয়া হয়নি।

নিজের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সালাম আজাদ বলেন, তার কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই এবং তিনি সম্পূর্ণ নির্দলীয়।

নতুন করে ডিআইএতে পদায়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি নিজেই পদায়নের জন্য আবেদন করেছিলেন। ডিআইএর পরিচালক নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় তাকে সহযোগিতা করার জন্য আগে সেখানে কাজ করেছেন—এমন একজন কর্মকর্তার প্রয়োজন ছিল। প্রায় পাঁচ বছর দপ্তরটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে তাকে পদায়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিআইএর মতো বিতর্কিত একটি দপ্তরে আবার দায়িত্ব নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সালাম আজাদ বলেন, তিনি সেখানে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটিকে বিতর্কমুক্ত করতে চান।

তবে শিক্ষা ক্যাডারে আলোচনা রয়েছে, ডিআইএতে পদায়ন পেতে তিনি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে সালাম আজাদ বলেন, এ ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভুয়া।

আগের কর্মস্থল নিয়েও আলোচনা

পিডিএসের তথ্য অনুযায়ী, সালাম আজাদের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ। তিনি ২০২২ সালের ২২ মে থেকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এরপর তাকে নায়েমে ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত করা হয় এবং ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। বর্তমানে তিনি নায়েমেই কর্মরত রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, তোলারাম কলেজ থেকে তাকে বদলি করার উদ্যোগ নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব তৈরি করে সেই বদলি বাতিল করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে আলোচনা থাকলেও কারা মব তৈরি করেছিল বা কী প্রক্রিয়ায় বদলি বাতিল হয়েছিল, তার কোনো নথি প্রতিবেদকের হাতে নেই।

ডিআইএ নিয়ে পুরোনো অভিযোগ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিআইএর মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করা। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ, আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয় ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়।

একইভাবে পরিদর্শন বা অডিট প্রতিবেদনে তথ্য পরিবর্তন কিংবা অনুকূলে প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

সচিব যা বললেন

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, আব্দুস সালাম আজাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগের কথা তিনি শুনছেন।

পদায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, আদিষ্ট হয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পদায়নের কাজ করেছেন।

তবে পদায়নের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের কোনো বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

এদিকে সালাম আজাদের নতুন পদায়নের আদেশ এখনো সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়নি বলে জানা গেছে।

তবে হাতে আসা আদেশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তিনি ডিআইএতে যোগদান করতে পারেন। একই সঙ্গে পদায়ন বাতিলের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর