[email protected] সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

২০২৮ শিক্ষাবর্ষে বদলে যাবে কারিকুলাম, আসছে বড় ধরনের সংস্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ আগষ্ট ২০২৬ ৩:০৮ পিএম

সংগৃহীত ছবি

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

তিনি বলেন, শুধু পরীক্ষার ফল বা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।

 

সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষা খাতের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন।

 

তিনি জানান, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুনভাবে সাজানো হবে দেশের পুরো শিক্ষাক্রম। এর আগে পরিবর্তনের প্রস্তুতি হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যক্রমেও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংযোজন, সংশোধন ও পরিমার্জন করা হচ্ছে।

 

মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষা খাতকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও গুণগত পরিবর্তন আনতে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

নতুন বিষয়ে গুরুত্ব প্রযুক্তি ও খেলাধুলায়

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করার কথা জানান তিনি। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষার ওপর ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

 

নতুন শিক্ষাক্রমে রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

 

এসএসসির ফল নিয়ে যা বললেন

সাম্প্রতিক এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, এবার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় যে ফল অর্জন করেছে, সেটিই প্রকাশ করা হয়েছে।

 

তার দাবি, অতীতে ফলাফলের পরিসংখ্যান ভালো দেখাতে কৃত্রিমভাবে বেশি জিপিএ-৫ দেওয়ার প্রবণতা ছিল। সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসে এবার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ

এসএসসিতে অকৃতকার্য কিংবা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা।

 

তিনি বলেন, এসব শিক্ষার্থীকে বোঝা হিসেবে না দেখে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি), স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ভোকেশনাল কোর্সে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে।

জেলা পর্যায়ে চালু হবে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’

 

তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান মাহদী আমিন।

 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থায় চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার তথ্য নিবন্ধন করতে পারবেন। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠান তাদের প্রয়োজনীয় জনবলের তথ্য দিতে পারবে। এতে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করে পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এটি সম্প্রসারণ করা হবে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এই ব্যবস্থার আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’

শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও জানান তিনি। ধাপে ধাপে প্রাথমিক থেকে উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ট্যাবলেট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

এর মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।

 

গবেষণায় শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মাধ্যমে তার সমাধান খোঁজার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

এ ছাড়া বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ‘ব্রেন ড্রেন’ কমিয়ে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা খাতে সরকারি অর্থায়নও বাড়ানোর কথা জানান তিনি।

 

গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমানোর উদ্যোগ

শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগের পার্থক্য কমাতেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।

 

এর অংশ হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ‘গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশে ‘ইনোভেশন ও স্টার্টআপ কম্পিটিশন’ আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার সুযোগ তৈরি হবে।

 

মাহদী আমিন বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু সনদ অর্জনকারী শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়। দক্ষতা, কর্মসংস্থানের সক্ষমতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।

এসআর

সম্পর্কিত খবর