বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে দ্রুত ঢাকায় পাঠাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ করেছেন তার সহপাঠীরা।
পরবর্তীতে ঢাকায় নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরাফাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রশাসনের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বরিশালের দপদপিয়া সেতুতে একটি বাসের সঙ্গে মাহিন্দ্রার সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন আরাফাত। তিনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ছুটে যান।
সহপাঠী মো. রাজিবের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে ফোন করে আরাফাতের চিকিৎসার জন্য দ্রুত সহায়তা এবং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। তার দাবি, প্রথমে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও সেটি আর করা হয়নি। পরে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স পেতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
রাজিব বলেন, আরাফাতকে দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রশাসনকে বারবার জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় কয়েক ঘণ্টা পর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ ও রেজিস্ট্রার ড. আবদুল আলিম বছির হাসপাতালে যান বলে জানা গেছে। ততক্ষণে আরাফাতের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে বলে সহপাঠীরা জানান।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আরাফাতের অবস্থার অবনতি হলেও দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ যথাসময়ে নেওয়া হয়নি।
বাংলা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় বলেন, দুর্ঘটনার পর তারা কয়েক ঘণ্টা ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাদের দাবি ছিল দ্রুত একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে আরাফাতকে ঢাকায় পাঠানো। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা পেতে অনেক দেরি হয়েছে।
তার ভাষ্য, অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়ার সময় আরাফাতের শারীরিক অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরাফাতের এক সহপাঠী দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যোগাযোগের পর একটি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ছিল না। অক্সিজেন সরবরাহ নিয়েও সমস্যা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, আরও আগে ঢাকায় নেওয়া সম্ভব হলে অন্তত উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আবদুল আলিম বছির বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজস্ব অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং তিনি আহত শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিলেন বলেও জানান রেজিস্ট্রার।
তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হয়নি। তবে তাদের কোনো ভুল বা অবহেলা প্রমাণিত হলে সেই দায় তারা গ্রহণ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদও বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়। সড়কে যানজট থাকায় ঘটনাস্থল বা হাসপাতালে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগেছে।
এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা কেন করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ওই সময়ে দ্রুততম উপায়ে আরাফাতকে ঢাকায় পাঠানোর বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য এসি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি সেভাবে সামনে আসেনি বলেও জানান তিনি।
আরাফাতের মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গায়েবানা জানাজা শেষে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আরাফাতকে সময়মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তারা প্রশাসনের ভূমিকা তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এসআর