সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত ১৩টি বন্ধু রাষ্ট্রের নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে
(Multinational Maritime Defense Alliance) বাংলাদেশ সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি রিয়াদে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠক শেষে এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়, যার সদর দপ্তর হবে সৌদি আরবে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং সমুদ্র নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এই অংশগ্রহণকে একটি নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা কূটনীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জোটের উদ্দেশ্য ও বর্তমান বাস্তবতা
এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যৌথ সামরিক মহড়া ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এখন লোহিত সাগরের ওপর নির্ভর করছে। তবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই রুটে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের ১০-১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য রক্ষায় এবং জ্বালানি সংকট এড়াতে এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক ও সমন্বিত উদ্যোগ।
জোটের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ
সৌদি আরবসহ এই জোটের ১৪টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হলো— বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, মিশর, জর্ডান, ইয়েমেন, সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া এবং কমোরোস। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান আপাতত এই জোটে অংশ নেয়নি।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামরিক লাভ
১. জ্বালানি নিরাপত্তা: বাংলাদেশের জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির প্রধান সমুদ্রপথ নিরাপদ থাকলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে।
২. প্রবাসী কল্যাণ: মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
৩. নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি: Forces Goal 2030-এর অধীনে আধুনিক নৌ-কৌশল, তথ্য সংগ্রহ ও যৌথ মহড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
৪. নতুন বাজার: পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ঝুঁকি ও কূটনৈতিক পরীক্ষা
এই জোটে অংশগ্রহণের কিছু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। প্রথমত, ইরান একে নিজেদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ভাবলে তেহরানের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সংবিধানে উল্লিখিত ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতি বজায় রেখে সামরিক ব্লকে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে। এছাড়া, সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নৌ-সদস্যদের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে। সর্বোপরি, প্রতিরক্ষা অংশীদার চীন এবং আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিশেষে, সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি মূলত নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ‘Bangladesh First’ নীতিরই প্রতিফলন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেদের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখাই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল পরীক্ষা।
এসআর