[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

কঠোর গোপনীয়তায় যেভাবে তৈরি হয় পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬ ৮:১০ পিএম

সংগৃহীত ছবি

চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের

 সৃজনশীল অংশে ভুল থাকাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নে কীভাবে ভুল থেকে গেল এবং তা পরীক্ষার কেন্দ্রেও পৌঁছে গেল? তীব্র সমালোচনার মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে প্রশ্নে দুটি ভুল ছিল।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার অন্তত দুই বছর আগে বিগত সরকারের নিয়োজিত মডারেটরদের মাধ্যমে এই প্রশ্নপত্র তৈরি ও পরিমার্জন করা হয়েছিল।

তবে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, মূল্যায়নের সময় ওই ভুল প্রশ্ন দুটির জন্য পুরো নম্বর যোগ করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী শিক্ষকদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুধাপবিশিষ্ট।

​খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরি

​বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রশ্ন তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার অন্তত এক বছর আগে। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে অভিজ্ঞ ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একটি তালিকা থাকে। সেই তালিকা থেকে একেকটি বিষয়ের জন্য চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই শিক্ষকরা শিক্ষা বোর্ডের নির্দিষ্ট কক্ষে বসে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আলাদাভাবে খসড়া প্রশ্ন তৈরি করেন। এ সময় তাদের কাছে কোনো মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস থাকে না। ফলে কার প্রশ্নে কী আছে, তা কেউ জানতে পারেন না। খসড়া তৈরি শেষে তা সিলগালা খামে বোর্ডে জমা দেওয়া হয়।

​সংশোধন ও পরিমার্জন

​খসড়া প্রশ্নপত্র জমা পড়ার পর তা যাচাই-বাছাই, ভুল সংশোধন ও পরিমার্জনের জন্য আরও চারজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই শিক্ষকরাও বোর্ডের কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বেষ্টিত কক্ষে বসে কাজটি করেন। এই ধাপে দায়িত্বরত শিক্ষকরা প্রয়োজনে আগের প্রশ্ন বাদ দিয়ে নতুন প্রশ্নও যুক্ত করতে পারেন। কাজের পুরো সময় তারা বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন, এমনকি তাদের খাবার-দাবারও ওই কক্ষেই সরবরাহ করা হয়। পরিমার্জন শেষে তারাও প্রশ্নপত্রগুলো সিলগালা খামে নিজ নিজ বোর্ডে জমা দেন।

​সেট চূড়ান্তকরণ ও লটারি

​সংশোধন ও পরিমার্জনের পর প্রতিটি বোর্ড থেকে প্রতি বিষয়ের ৪ সেট করে প্রশ্ন তৈরি করা হয়। নয়টি বোর্ড থেকে মোট ৩৬ সেট প্রশ্ন জমা পড়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কার্যালয়ে। সেখানে সব বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে সারা দেশের জন্য চূড়ান্ত ৪ সেট প্রশ্ন নির্বাচন করা হয়। লটারি হয়ে যাওয়ার পর কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষকের আর সেই প্রশ্ন দেখার সুযোগ থাকে না। এরপর সিলগালা অবস্থায় ২ সেট প্রশ্ন সরাসরি সরকারি ছাপাখানায় (বিজি প্রেস) পাঠানো হয় এবং বাকি ২ সেট বিকল্প হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। যেমন—অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে স্থগিত হওয়া চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষাগুলো পরবর্তীতে এই বিকল্প প্রশ্ন সেট ব্যবহার করেই নেওয়া হবে।

​ছাপাখানা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র

​পরীক্ষার অন্তত ৩ থেকে ৪ মাস আগে চাহিদাপত্র অনুযায়ী বিজি প্রেসে কঠোর নিরাপত্তায় প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজ শুরু হয়, যা শেষ হতে প্রায় দুই-আড়াই মাস সময় লাগে। ছাপাখানায় যুক্ত কর্মীরাও যেন প্রশ্ন দেখতে বা ফাঁস করতে না পারেন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়। মুদ্রণ শেষে সিলগালা প্যাকেটগুলো পুলিশি পাহারায় প্রতিটি জেলার ট্রেজারি কার্যালয়ের লোহার ট্রাংকে রাখা হয়। পরীক্ষার কয়েক দিন আগে তা থানা বা পুলিশ ফাঁড়িতে এবং পরীক্ষার দিন সকালে কড়া পাহারায় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। পরীক্ষা শুরুর মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মিনিট আগে ঢাকার আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান চূড়ান্ত ২ সেটের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে মূল পরীক্ষার জন্য ১ সেট নির্বাচন করেন। তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হলে কেবল সেই নির্দিষ্ট সেটের সিলগালা খুলে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং বাকি সেটটি অক্ষত অবস্থায় বোর্ডে ফেরত যায়।

​কঠোর প্রক্রিয়ার পরেও কেন ভুল হয়?

​বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, এত কঠোর ও গোপনীয় ব্যবস্থার পরও মূলত দুটি কারণে প্রশ্নে ত্রুটি দেখা দেয়। প্রথমত, 'প্রিন্টিং মিসটেক' বা ছাপাখানাজনিত ভুল। প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর থেকে পরীক্ষার দিন পর্যন্ত তা দেখার কোনো সুযোগ না থাকায় এই ভুলগুলো আগেই সংশোধন করা সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, চরম অবহেলা। সম্প্রতি এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নে যে ভুলটি ধরা পড়েছে, তা কোনো ছাপার ভুল ছিল না, বরং প্রশ্নকর্তা ও মডারেটরদের চরম গাফিলতি ছিল। তদন্তে দেখা গেছে, এই প্রশ্নটি তৈরি ও পরিমার্জন করেছিলেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন শিক্ষক। নিয়ম অনুযায়ী ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর