প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়ার স্থায়ী সমাধানে একটি যুগোপযোগী ও
আধুনিক শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে এই নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষকদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, কর্মমূল্যায়ন, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতাসহ পেশাজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য সুস্পষ্ট রূপরেখা ও দিকনির্দেশনা থাকবে। নতুন নীতিমালার মূল ভিত্তি হবে তিনটি— শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি স্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো প্রতিষ্ঠা। এর ফলে শিক্ষকরা তাদের পেশাগত অগ্রগতির বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট গাইডলাইন পাবেন।
এই নীতিমালায় শিক্ষকদের বেতন-কাঠামোর উন্নয়ন এবং আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের প্রধান দাবি ‘১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণ’-এর বিষয়টি বর্তমানে সরকারের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হলে তা মেটাতে বাজেটেও প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখার চেষ্টা চলছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি সংযোজন নয়, বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে।
নতুন নীতিমালার পাশাপাশি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর তীব্র শিক্ষক সংকট, যা বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় প্রকট রূপ নিয়েছে। পদোন্নতি সংক্রান্ত একটি মামলা আদালতে ঝুলে থাকায় সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এর ফলে দেশের প্রায় ৩২ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে বিদ্যালয় পরিচালনা ও একাডেমিক তদারকিতে জটিলতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই চরম শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অস্থায়ীভাবে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে সরকার। নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে এই অন্তর্বর্তীকালীন উদ্যোগটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে যে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি জটিলতার অবসান এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমেই একটি ভবিষ্যৎমুখী প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
এসআর