রাজধানীর ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ এলাকার বিএনপির রাজনীতিতে সিংহ পুরুষ, দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ সালাহ উদ্দিন আহমেদ আর নেই।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ২০২৬) রাত ৮টা ১০ মিনিটে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর এই চিরবিদায়ে স্বজনদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের গভীর ছায়া, সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন ছেলে তানভীর আহমেদ রবীন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সালাহ উদ্দিন আহমেদের দ্বিতীয় পুত্র। এবং নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাবার মৃত্যুর খবর জানিয়ে তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার (১৪ অক্টোবর) আলহাজ্ব সালাহউদ্দিন আহমেদ (সাবেক সংসদ সদস্য ঢাকা- ৪ ও ৫) এর নামাজে জানাজার সময়সুচি: বুধবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০২৬
১ম নামাজে জানাজা: সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। ২য় নামাজে জানাজা: বাদ যোহর ১:৩০ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। ৩য় নামাজে জানাজা: বিকেল ৩টায় শ্যামপুর লাল মসজিদ প্রাঙ্গণে। বিকেল ৩টায় শ্যামপুর লাল মসজিদে জানাজা শেষে জুরাইন কবরস্থানে তার বাবার কবরে দাফন সম্পন্ন করা হবে ইনশাআল্লাহ।
সালাহ উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় জিয়াউর রহমানের সহযোদ্ধা হিসেবে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকার শ্যামপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিতি ছিল। বিশেষ করে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ এলাকার বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী ও পরিচিত নেতা। তাঁর অনুসারীদের অনেকে তাঁকে এই অঞ্চলের বিএনপির ‘সিংহপুরুষ’ বলে অভিহিত করতেন।
১৯৯১ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সালাহ উদ্দিন আহমেদ। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে এই এলাকার রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব অবস্থান তৈরি হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ আমলে কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা: সালাহ উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে। পরিবার ও দলীয় অনুসারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা দাবি করেন।
২০২৩ সালেও যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। সে সময় তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ রবীন বাবাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের এসব ঘটনা তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামময় পথচলার অংশ হয়ে রয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের দিন হত্যার উদ্দ্যেশে হামলা: ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন হামলার শিকার হন সালাহ উদ্দিন আহমেদ। ঢাকা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী হিসেবে ভোট দিতে গিয়ে রাজধানীর শ্যামপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের কাছে হামলায় আহত হন তিনি। সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মীও আহত হন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
হামলার জন্য তখন তিনি স্থানীয় আওয়ামিলীগ এবং জাতীয় পার্টির সমর্থকরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ওই নির্বাচনী হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়। ২০২৪ সালে তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ রবীন এ ঘটনায় মামলা করেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
সালাহ উদ্দিন আহমেদের অনুসারীদের অভিযোগ ছিল, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছিল। তবে হামলার পেছনে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আলোচিত ও বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা: সংসদ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সালাহ উদ্দিন আহমেদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের প্রসঙ্গও আলোচিত হয়। তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ রবীনের বক্তব্য অনুযায়ী, বাবার তত্ত্বাবধানে এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, মা ও শিশু হাসপাতাল স্থাপন, সড়ক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ঢাকা-৪ এলাকার বিভিন্ন জনপদে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের সঙ্গে তাঁর নাম স্থানীয়ভাবে যুক্ত ছিল বলে তাঁর অনুসারীরা উল্লেখ করেন। এসব উদ্যোগের বিস্তারিত প্রকল্পভিত্তিক তথ্য ও স্বতন্ত্র নথি পাওয়া গেলে তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
তাঁর ছেলে রবীনও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তাঁর বাবা একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নের সূচনা করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ তাঁর পরিচিতির অন্যতম ভিত্তি ছিল।
রাজনৈতিক সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোক: সালাহ উদ্দিন আহমেদের মৃত্যুর খবরে তাঁর পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দীর্ঘদিনের অনুসারীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ এলাকার বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এই নেতার মৃত্যুতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
দলীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন, বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিন হামলার ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা থাকবে।
পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামীকাল বাদ জোহর শ্যামপুর লাল মসজিদে অনুষ্ঠিতব্য জানাজায় অংশ নিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসআর