রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন হোসেন শান্তর বিরুদ্ধে।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে ভয়ভীতি, মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শান্ত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ডে বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. রিপন হোসেন সহযোগিতা করতেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি বিমানবন্দর এলাকায় এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় চক্রটির কয়েকজন সদস্য স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শান্ত ও বিমানবন্দর সাংগঠনিক ইউনিট বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের ১০০ গ্রাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শান্তসহ স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের চার নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঘটনার পর রিপনসহ আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এ চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন শান্ত। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন বিমানবন্দর সাংগঠনিক ইউনিট বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ, বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. রিপন হোসেনসহ স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। তাদের হয়ে মাঠে কাজ করত স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।
কোনো জায়গায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদা আদায় কিংবা কোনো বিরোধে পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজন হলে শান্তর নেতৃত্বে লোকজন জড়ো করা হতো বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভয়ভীতি দেখানো, মারধর ও চাপ সৃষ্টির কাজে কিশোর-তরুণদের ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় নির্মাণকাজ, মাটি কাটা ও সরানো, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন এবং মালপত্রবাহী গাড়ি চলাচলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা আদায় করা হচ্ছিল। বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, গাড়ি আটকে দেওয়া কিংবা লোকজন পাঠিয়ে ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জমি, নির্মাণকাজ কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেও শান্তর লোকজন সেখানে গিয়ে এক পক্ষের হয়ে অবস্থান নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দলবল নিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, মারধর কিংবা জায়গার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হতো বলেও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এসব কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায়ের শক্তি হিসেবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা আদায়, ভয় দেখানো কিংবা বিরোধে হামলার মতো ঘটনায় তাদের সামনে রাখা হতো। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের নাম সামনে এলেও মাঠে সক্রিয় থাকত কিশোর-তরুণদের একটি দল বলে স্থানীয়দের দাবি।
শান্তর বিরুদ্ধে অর্থ লুট ও মারধরের অভিযোগে একাধিক মামলাও রয়েছে। গত ৭ মার্চ উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের করা একটি মামলায় বিমানবন্দরের ডিএল ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারধর করে ক্যাশ থেকে ৯০ হাজার টাকা লুটের অভিযোগ করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর শান্তসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে কর্মীদের মারধর করেন। পরে আবারও সংঘবদ্ধ হয়ে পাম্পে গিয়ে হামলা চালিয়ে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ৪ এপ্রিল দক্ষিণখান থানায় শান্তকে প্রধান আসামি করে আরেকটি মামলা হয়। এতে যুবদল নেতা মো. রাসেল সরকারসহ তিনজনকে মারধরের অভিযোগ করা হয়। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক কয়েকজন নেতা জানান, সরকারি স্যুয়ারেজ লাইনের উন্নয়নকাজের জন্য খনন করা মাটি সরানো ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে শান্ত ও তার সহযোগীরা লাঠিসোঁটা, ইট, ধারালো অস্ত্র ও রড নিয়ে হামলা চালান বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগ ও মামলা থাকার পরও শান্ত বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়ে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইতেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
গত ২৮ আগস্ট রাতে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর এক প্রবাসীর স্বজনের কাছ থেকে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় এই চক্রের কর্মকাণ্ড নতুন করে সামনে আসে।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী কাউসার তার বোনের বিয়ে ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য ২০০ গ্রাম স্বর্ণ দেশে পাঠান। বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণ নিয়ে তার ভাই সুমন ও বন্ধু রোহান চৌধুরী বের হওয়ার পর বলাকা ভবনের বিপরীতে তাদের পথরোধ করা হয়। পরে মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।
ওই ঘটনায় করা মামলায় বিমানবন্দর সাংগঠনিক ইউনিট বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ, বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. রিপন হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন হোসেন শান্ত এবং বিমানবন্দর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রানা হোসাইন রুবেলকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ শান্ত ও রউফকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের ১০০ গ্রাম উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রবাসীরা স্বর্ণ বা মূল্যবান মালপত্র নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর তাদের গতিবিধি নজরদারি করার চেষ্টা করত অপরাধীরা। কে কী পরিমাণ স্বর্ণ বা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বের হচ্ছেন, কোন গাড়িতে যাচ্ছেন এবং কোথায় নামছেন—এসব তথ্য কীভাবে তাদের কাছে পৌঁছাত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় আর কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান কালবেলাকে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে আসামিদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনার পর বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. রিপন হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন হোসেন শান্তকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ-উর-রহমান সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করেন।
একই সঙ্গে ছাত্রদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে রিপন হোসেন ও আল-আমিন হোসেন শান্তর সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এসআর