[email protected] মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক ১৪৩৩

মেরিনড্রাইভে অনুমোদনহীন আড়াই শতাধিক রিসোর্ট, সৈকত দখলের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ৪:১৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ সড়কের দুই পাশে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনার মধ্যে প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ এলাকায় তারকামানের মাত্র ২০ থেকে ২৫টি স্থাপনার নকশা অনুমোদন পেয়েছে।

 

সম্প্রতি উখিয়ার ইনানী এলাকায় টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। ভবনটির নকশায় কউকের অনুমোদন ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই নোটিশ দেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

রেস্তোরাঁ থেকে রিসোর্ট

মেরিনড্রাইভের উখিয়া অংশের ইনানী এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে পর্যটকদের সেবা দেওয়া অন্তত দুই ডজন প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন হোটেল, বিচ রিসোর্ট, ভিলা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠান। এসবের কয়েকটি নিজেদের ইকো রিসোর্ট হিসেবেও প্রচার করছে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এ এলাকায় রেস্তোরাঁর সংখ্যাই বেশি ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হয়ে আবাসিক সুবিধাসহ হোটেল ও রিসোর্টে রূপ নিয়েছে। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রেও প্রথমে রেস্তোরাঁ দিয়ে ব্যবসা শুরু করে পরে আবাসনসেবা যুক্ত করা হয়। একইভাবে আরও কয়েকটি রেস্তোরাঁর পাশে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল আমিন জানান, গত এক দশকে এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। ছোট রেস্তোরাঁগুলো ধীরে ধীরে বড় পরিসরের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

সৈকত ও বালিয়াড়ি দখলের অভিযোগ

মেরিনড্রাইভের কয়েকটি স্থাপনার বিরুদ্ধে সৈকত ও বালিয়াড়ি দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সোনারপাড়া রিসোর্টের বিপরীতে সৈকতের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা ‘ঝাউবাগান বিচ রেস্টুরেন্ট’ পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) অবস্থিত। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।

 

উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থাপনাটি উচ্ছেদে অভিযান চালানো হলেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা চালিয়ে যায়। রেস্তোরাঁটির পরিচালক মনিরের দাবি, তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও কউকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

এ ছাড়া সৈকতের বালিয়াড়িতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি ‘সাদাবালি’ নামের একটি রিসোর্ট পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটিরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মী জানান, মালিকপক্ষ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে।

 

শুধু স্থাপনা নির্মাণ নয়, সৈকতের বিভিন্ন অংশে চেয়ার বসিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রচার চালানোর অভিযোগও রয়েছে একাধিক হোটেল ও রিসোর্টের বিরুদ্ধে।

 

পরিবেশ রক্ষায় জরিমানা ও মামলা

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, সমিতির আওতাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার অনেক রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে সৈকত দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং বিধিবিধান না মানার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।

 

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি

অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটনপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যৌথ অভিযান চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ কাজে কউক, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যুক্ত থাকবে।

 

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান জানান, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হোটেলগুলোর বৈধতা নিশ্চিত করতে মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান শুরু হবে।

 

কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দীন জানান, অনুমোদনহীন হোটেলগুলোর মালিকপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে অভিযান পরিচালনায় বিলম্ব হলেও দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

পরিবেশকর্মীদের মতে, পর্যটনশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও সেবা সহজ করতে সমন্বিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সৈকত ও পরিবেশ সুরক্ষিত থাকলেই পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব।

এসআর

সম্পর্কিত খবর