প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচুর্যে থাইল্যান্ডের পাতায়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালির চেয়ে কোনো অংশে
কম নয় কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের অধিকারি এই পর্যটন নগরীতে রয়েছে পাহাড়, সবুজ বনভূমি, দ্বীপ, প্রবাল প্রাচীর, সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। বিমান, ট্রেন ও আধুনিক সড়ক যোগাযোগের সুবিধার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক এখানে ভ্রমণ করলেও আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থান তৈরি করতে পারেনি উপকূলীয় এই শহরটি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যে বৈচিত্র্যময় বিনোদন, বিশ্বমানের সেবামান, নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো প্রয়োজন, তার অনেক কিছুরই ঘাটতি রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, সহজ ভিসাপ্রক্রিয়া, প্রশিক্ষিত গাইড এবং বহুভাষিক তথ্যসেবার অভাব অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া সৈকতের বাইরের সম্ভাবনাময় স্থানগুলোকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনপণ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করা যাচ্ছে না।
আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারের ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় আন্তর্জাতিক গন্তব্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে মূল সমস্যাগুলো উঠে এসেছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে থাকার কারণ
কক্সবাজারের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি পর্যটকদের আগমন এখনো বেশ সীমিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, বিগত দুই দশকের তুলনায় সৈকতে বিদেশি পর্যটকের সমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যদিও এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বা পৃথক হালনাগাদ তথ্য পাওয়া দুষ্কর।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা জানান, বৈশ্বিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে কক্সবাজারের প্রধান পার্থক্য হলো পর্যটনপণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে প্রায় ৭০ লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের পাতায়ায় সারা বছরজুড়ে ম্যারাথন, সংগীত, চলচ্চিত্র, আতশবাজি প্রদর্শনী, ওয়াটার স্পোর্টস ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মতো ৫০টিরও বেশি বড় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। অথচ কক্সবাজারে ভ্রমণকারীদের প্রধান এবং প্রায় একমাত্র আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত। বেশিরভাগ পর্যটকের সার্বিক সফর হোটেল, সৈকত, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সৈকতের পাশাপাশি বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক উৎসব, জলক্রীড়া, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বৈচিত্র্যময় বিনোদনমূলক ইভেন্টের নিয়মিত আয়োজন করা জরুরি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, কক্সবাজারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও হোটেল-রিসোর্ট বাড়লেও বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখার মতো সমন্বিত উদ্যোগ নেই। উপরন্তু, পর্যটকদের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি ও অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার মতো অভিযোগও মেলে। এসব জটিলতা দূর না হলে বৈশ্বিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই কি যথেষ্ট?
কক্সবাজারকে বিশ্বমানের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বহু অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। রেলে যাতায়াত সহজ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটক বাড়লেও কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা যাবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টোয়াক)-এর সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, কেবল বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হলেই আন্তর্জাতিক পর্যটক আসবে না। এর জন্য দরকার সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু, সহজ ভিসা সুবিধা, উন্নত আবাসন, দক্ষ জনবল, বহুভাষিক তথ্যসেবা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালো প্রচারণা। সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজারকে একটি সম্পূর্ণ পর্যটন প্যাকেজ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে।
রাতের বিনোদন ও আন্তর্জাতিক সেবার অভাব
বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে রাতের বিনোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পর্যটকরা দিনে দর্শনীয় স্থান ঘুরে সন্ধ্যায় ও রাতে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত, কেনাকাটা কিংবা পারিবারিক বিনোদনে অংশ নেন। তবে কক্সবাজারে এই সুযোগ খুবই সীমিত।
সম্প্রতি গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুগন্ধা পয়েন্টের একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত ডিজে নাইটকে কেন্দ্র করে পুলিশের অভিযান রাতের বিনোদনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের সুরক্ষার তাগিদে তল্লাশি চালানো হলেও অভিযোগে উল্লিখিত কিছু না পেয়ে পার্শ্ববর্তী কটেজ জোন থেকে অসামাজিক কাজের অভিযোগে ২১ জনকে আটক করা হয়।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটকরা সারা দিন প্রকৃতি দেখার পর রাতে কোথায় বিনোদন পাবেন—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। কক্সবাজারকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিতে হলে বৈধ, নিরাপদ ও সুনিয়ন্ত্রিত নৈশ বিনোদনের সুব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইনি কাঠামোর মধ্যে তদন্তের মাধ্যমে অপরাধ দমন ও বৈধ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আশেপাশের সম্ভাবনাময় অঞ্চলের অবহেলা
কক্সবাজার শহরের বাইরে হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মতো স্থানগুলোতে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করা যায়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কক্সবাজার গন্তব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা (২০২৫–২০২৭)-তেও এসব এলাকার দূরদর্শিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরিবহন, মানসম্মত আবাসন, স্যানিটেশন ও নিরাপদ সেবার অভাবে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং, কায়াকিং, ট্র্যাকিং ও স্থানীয় ঐতিহ্যনির্ভর পর্যটনের প্রসার ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
পরিবেশ দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট
আন্তর্জাতিক পর্যটনে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ কক্সবাজার ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম জানান, গত ঈদুল ফিতর পরবর্তী মাত্র তিন দিনে সৈকত থেকে এক টনের বেশি ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হয়েছে। পুরো কক্সবাজার শহরে দৈনিক প্রায় ১৮০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। তাছাড়া অধিকাংশ হোটেলে কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (STP) না থাকায় অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সাগরে মিশছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাবদ্ধতা।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন এবং পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা ও অবস্থানকাল সংক্রান্ত পৃথক উপাত্ত না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন। পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়ানো সম্ভব হলে আবাসন, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় হস্তশিল্পে আরও বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের উন্নয়নে একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। সৈকত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা, নিরাপত্তা ও প্রচারণার দায়িত্ব একক কোনো কর্তৃপক্ষের হাতে না থাকায় সমন্বিত উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ডিং করতে হলে একটি টেকসই ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনার কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন, যেখানে স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে।
এসআর