সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই আকাশে দেখা মেলে পাখিদের ঝাঁক।
এ গ্রামের মানুষ শুধু পাখিদের আগমন উপভোগই করেন না, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বও নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে পরিযায়ী ও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণস্থল হয়ে ওঠা নাজিরপাড়ায় স্থানীয়দের সচেতনতা ও ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে পাখি সংরক্ষণের অনন্য পরিবেশ।
গ্রামের বিভিন্ন বড় গাছ ও বাঁশঝাড়ে এখন শত শত পাখির বাসা। এর মধ্যে শামুকখোল, পানকৌড়ি ও বালিহাঁসের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর জুন-জুলাইয়ের দিকে এসব পাখি নাজিরপাড়ায় এসে আশ্রয় নেয়। গাছের ডালে বাসা তৈরি করে ডিম দেয় এবং পরে ছানাদের বড় করে তোলে।
প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অবস্থানের পর নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে বংশবিস্তার শেষে পাখিগুলো আবার নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে যায়।
বছরের পর বছর একই সময়ে পাখিদের এই আগমন ও প্রস্থান চলছে। নিরাপদ পরিবেশ, খাবারের সহজলভ্যতা এবং মানুষের সহযোগিতা পাওয়ায় পাখিগুলোও যেন নাজিরপাড়াকে নিজেদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বোদা হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা তমিজদার রহমান খোকা বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে নাজিরপাড়ায় শামুকখোল, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা রয়েছে।
পাখিগুলো দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ, সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখানে আসেন।
তিনি বলেন, কখনো কখনো বাইরে থেকে কেউ পাখি শিকার করতে এলেও গ্রামের মানুষ তাদের বাধা দেন।
পাখিদের রক্ষা করতে স্থানীয়রা সবাই একসঙ্গে কাজ করেন।
সকালে পাখির ডাকেই অনেকের ঘুম ভাঙে। পাখির মলমূত্রে কিছুটা অসুবিধা হলেও বিষয়টি গ্রামের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন।
তবে পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে পাখিদের খাবারও দিয়ে থাকেন বলে জানান তমিজদার রহমান।
পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থী জয়নাল বলেন, একসঙ্গে এত পাখি দেখে তার খুব ভালো লেগেছে। চারপাশের কিচিরমিচির শব্দ ও পাখিদের চলাফেরা তাকে মুগ্ধ করেছে।
পাখিগুলো যাতে নির্বিঘ্নে থাকতে পারে এবং কেউ তাদের বিরক্ত বা ক্ষতি না করে, সেদিকে সবাইকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ওরা আমাদের অতিথি। তাই অতিথিদের যেন আমরা যথাযথভাবে দেখভাল করি, সেটি মনে রাখতে হবে।’
বোদা পাথরাজ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রওশন আরা বেগম বলেন, শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশে আসে।
খাদ্যের সন্ধান, প্রজননের উপযোগী পরিবেশ এবং নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তারা প্রতিবছর ফিরে আসে।
তিনি জানান, প্রজনন মৌসুম শেষ হলে এবং নিজ আবাসস্থলের আবহাওয়া অনুকূল হলে পাখিগুলো আবার সেখানে ফিরে যায়। শামুক, ছোট মাছ ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় এসব পাখির অন্যতম খাবার।
প্রাণিবিদ্যার এই শিক্ষক আরও বলেন, পরিযায়ী পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পাখির মল মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। তাই এসব পাখির আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি।
বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে নাজিরপাড়া একটি সমৃদ্ধ এলাকা। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সেখানে এসে বাসা বাঁধে এবং বংশবিস্তার করে।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করা হয়েছে এবং পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও পাখি সংরক্ষণের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক।
বাইরের দর্শনার্থী ও পর্যটকরা যাতে পাখিদের বিরক্ত না করেন, সে বিষয়েও সচেতন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে যেসব গাছে পাখিরা বাসা বাঁধে, সেসব গাছ সংরক্ষণের জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
নাজিরপাড়ায় মানুষ ও পাখির এই সহাবস্থান এখন স্থানীয়দের কাছে এক ধরনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবছর পাখিরা আসে, গাছের ডালে বাসা বাঁধে, ডিম থেকে ছানা ফোটায় এবং নতুন প্রজন্মকে উড়তে শেখায়। সময় হলে আবার ফিরে যায় দূরদেশের নিজ ঠিকানায়।
তবে তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থেকে যায় নাজিরপাড়া। মানুষের ভালোবাসা ও নিরাপদ আশ্রয়ে বছরের পর বছর এভাবেই অতিথি পাখিদের আপন ঠিকানায় পরিণত হচ্ছে গ্রামটি।
এসআর