চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের চকরিয়া-মাতামুহুরি অঞ্চলে তামাক কোম্পানির দাদনভিত্তিক চুক্তি, অগ্রিম
অর্থ, সার, বীজ ও সেচ সহায়তার প্রলোভনে খাদ্যশস্যের জমি গ্রাস করে ক্রমবর্ধমান হারে তামাক চাষ বাড়ছে, যার ফলে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুর মতো জরুরি খাদ্যশস্যের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। আইনগতভাবে তামাক মাদক না হলেও এতে থাকা উচ্চ আসক্তিকর নিকোটিন মাদকাসক্তির মতোই শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরি করে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে মে মাস পর্যন্ত চলা এই চাষাবাদের কারণে মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের ঘাটতি দেখা দিয়ে জমির উর্বরতা ও স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরবর্তী মৌসুমের ফসলের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
এছাড়াও তামাকের ভেজা পাতা তোলার সময় ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন প্রবেশ করায় কৃষক ও শ্রমিকরা বমিভাব, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতাযুক্ত ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে ওঠা তামাক শুকানোর ভাঁটির ধোঁয়ায় শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসের নানাবিধ জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
তামাক পাতা শুকানোর জ্বালানি কাঠের জন্য ব্যাপক বন উজাড়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকর রাসায়নিক বৃষ্টির পানিতে মিশে জলাশয়ের জলজ প্রাণীর ক্ষতি সাধন করছে।
যদিও বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী তামাকের ব্যবহার ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে বিকল্প ফসল চাষে পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনা, সহজ ঋণ ও নিশ্চিত বাজার ব্যবস্থার অভাব থাকায় কৃষকরা এই দাদনের মরণচক্র থেকে বের হতে পারছেন না।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান এবং চট্টগ্রাম জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ারের মতে, তামাকের কারণে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং কোম্পানিগুলো কৃষকদের সন্তানদের চাকরির প্রলোভন পর্যন্ত দেখাচ্ছে।
অন্যদিকে ইপসা-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করে বিকল্প ফসল চাষের ওপর সরকারি নীতিমালার মাঠপর্যায়ে কঠোর বাস্তবায়ন, তামাক চাষের সঠিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি, দাদন ব্যবসার ওপর নজরদারি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক শুকানোর ভাটি বন্ধে রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন।
এসআর