২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ধারণা। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় আরও কিছু বাস্তুচ্যুত মানুষ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় খুঁজেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়নের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার অগ্রাধিকার বদলে গেছে।
ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান তহবিল দিয়ে মৌলিক সেবাগুলো চালিয়ে নেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক পাচারকারী ও মানবপাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে।
হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও সময় সময় সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তরুণদের একটি অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনবসতির কারণে স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা বড় চাপের মুখে রয়েছে। সীমিত জায়গায় বিপুল মানুষের বসবাসের ফলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবসময় থাকে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। তবে তাদের অনেকেই এখনো নিয়মিত ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘদিন শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে ভবিষ্যতে সামাজিক সমস্যা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং মানবপাচারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শিশুদের জন্য কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
কক্সবাজার অঞ্চলের শরণার্থী ক্যাম্পগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখে থাকা একটি এলাকায় অবস্থিত। পাহাড়ি ঢালে গড়ে ওঠা অনেক বসতি বর্ষায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকে।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও ভারী বর্ষণের কারণে প্রায় প্রতিবছর আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
ক্যাম্পে দীর্ঘদিন বসবাস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক রোহিঙ্গাকে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে সাগরপথে বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নিরাপদ ও টেকসই সমাধানের অভাব থাকলে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনেও পড়েছে। শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, পরিবেশের ওপর চাপ, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বনভূমি পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নাগরিকত্বসংক্রান্ত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টায় এই জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
এসআর