ফুটবলের ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছেন, আলো ছড়িয়েছেন এবং একসময় মাঠকে বিদায় জানিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে এবার শেষবারের মতো মাঠে দেখা যাবে এই ফুটবল মহাতারকাকে। বুধবার ভোরে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ উপস্থিতি হতে যাচ্ছে। ফলে ম্যাচটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায়ের শেষ মুহূর্ত।
রোসারিও থেকে উঠে আসা মেসি সময়ের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে গেছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং, পাসিং কিংবা গোল করার দক্ষতায় তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পরিচয়। তবে জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে হতাশা—একাধিক ব্যর্থতা মেসিকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করে। এমনকি একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে ফিরে এসে বদলে দেন নিজের ও আর্জেন্টিনার গল্প।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা পান মেসি। পরের বছর ফিনালিসিমা জয়ের পর আসে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তোলেন তিনি। সেই অর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পরিসংখ্যানও তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলে আর্জেন্টিনার হয়ে তার আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়াবে ২০৮-এ, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি জাতীয় দলের জার্সিতে তার গোলসংখ্যা ১২৫।
বিশ্বকাপেও রয়েছে তার অসংখ্য রেকর্ড। বিশ্বকাপে মেসির গোল-অবদান ৩৩টি—২১ গোলের পাশাপাশি রয়েছে ১২টি অ্যাসিস্ট। তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরুর একাদশে মাঠে নামা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি।
তবে মেসিকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করা কঠিন। তার প্রভাব মাঠের বাইরেও বিস্তৃত। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও মনে করেন, মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে আলাদা। তার মতে, মেসির মতো খেলোয়াড়ের উপস্থিতি যেমন অনন্য, তেমনি তার শূন্যতাও হবে সহজে পূরণ করার মতো নয়।
সতীর্থদের জন্য মেসি শুধু অধিনায়ক নন, একজন আদর্শও। অনুশীলনে তার নিষ্ঠা, ম্যাচের প্রস্তুতি এবং দলের প্রতি দায়িত্ববোধ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তাই বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ঘিরে আবেগের মাত্রাও অন্যরকম। গ্যালারিতে থাকবে আর্জেন্টিনার পতাকা, মেসির জার্সি আর তার নাম ধরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। মেসিও হয়তো নিজের স্বাভাবিক ছন্দেই বল নিয়ে এগিয়ে যাবেন, সতীর্থকে পাস দেবেন কিংবা গোলের সুযোগ তৈরি করবেন।
কিন্তু এবার প্রতিটি মুহূর্তই হবে বিশেষ। কারণ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিকে দেখার এই সুযোগ আর ফিরে আসবে না।
তার বিদায় অবশ্য ফুটবলে তার উপস্থিতির ইতি টানবে না। বরং এটি হবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। যে খেলোয়াড় একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপার আক্ষেপে কেঁদেছেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিয়ে বিদায় নিচ্ছেন।
শেষ ম্যাচের পর মেসি মাঠ ছাড়বেন, কিন্তু তার কীর্তি থেকে যাবে ফুটবল ইতিহাসে। কোটি সমর্থকের স্মৃতিতে তিনি থাকবেন শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়—একটি যুগের প্রতীক হয়ে।
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হচ্ছে, কিন্তু মেসির গল্প শেষ হওয়ার নয়।
এসআর