[email protected] শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

৯-২-এর লজ্জা শুধু মাঠে নয়, প্রশ্নবিদ্ধ ডুলি-ম্যানেজমেন্টও

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২৬ ২:১৯ এএম

ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের পরাজয় দিয়ে FIFA ASEAN Cup অভিযান শেষ করেছে বাংলাদেশ। তিন ম্যাচে তিন হার, কোনো পয়েন্ট নেই। তবে জাকার্তার এই ভয়াবহ পরাজয়কে শুধু শক্তিশালী ইন্দোনেশিয়ার কাছে হার হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের ফুটবলের ভেতরের সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে।

কারণ ম্যাচের স্কোরলাইন যতটা বড়, তার চেয়েও বড় হয়ে সামনে এসেছে কোচ থমাস ডুলির পরিকল্পনা, দল নির্বাচন এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন।

ম্যাচের শুরুতে বাংলাদেশ কিছুটা সংগঠিত থাকলেও ১১ মিনিটে মিচেল বেকারের গোলের পরই যেন ভেঙে পড়ে দলের কাঠামো। ২০ মিনিটে দ্বিতীয় গোল, ৩২ মিনিটে তৃতীয়। ৩৬ মিনিটে শাহরিয়ার ইমন ব্যবধান কমালেও এক মিনিট পরেই বেকার নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। ৪২ মিনিটে তার চতুর্থ গোল এবং বিরতির অতিরিক্ত সময়ে জাস্টিন হাবনারের গোলে প্রথমার্ধ শেষ হয় ৬-১-এ। 

প্রশ্নটা তাই সরাসরি ডুলির কাছে—প্রথম ৪৫ মিনিটে একটি জাতীয় দল কীভাবে ছয় গোল হজম করে? প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে অজানা ছিলেন না ডুলি। ইন্দোনেশিয়ার গতি, উইং-ভিত্তিক আক্রমণ, দ্রুত ট্রানজিশন—সবই জানা ছিল। তারপরও বাংলাদেশের রক্ষণে বারবার একই ধরনের ফাঁক দেখা গেছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব, পজিশনিংয়ের ভুল, বল হারানোর পর দ্রুত রক্ষণে ফেরার ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছে মাঠে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনার চেয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা বেশি হয়েছে।


রাকিবকে ঘিরে প্রশ্ন, সাদের পজিশন নিয়েও অসন্তোষ। রাকিব হোসেনকে খেলানো নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন খেলোয়াড়কে দায়ী করে এই পরাজয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—ডুলি রাকিবের শক্তিটা কীভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন?

কারণ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোলটিও আসে রাকিবের ক্রস থেকে ফারহান আলী ওয়াহিদের মাধ্যমে। 

অর্থাৎ সমস্যা রাকিব খেলেছেন কি না, শুধু সেখানে নয়; সমস্যা হলো দলের আক্রমণভাগকে কার্যকর করার সামগ্রিক কাঠামো কোথায় ছিল।

একইভাবে সাদ উদ্দিনকে নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাকে যে পজিশনে এবং যে দায়িত্বে ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে তার ভূমিকা নিয়ে বারবার অস্পষ্টতা দেখা গেছে। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত আক্রমণের সামনে ফুলব্যাক পজিশনের পজিশনিং ও রক্ষণাত্মক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেই জায়গাতেই বারবার সমস্যায় পড়েছে।

ফারহানকে আগে কেন নয়? আরেকটি প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে ফারহান আলী ওয়াহিদকে ঘিরে।

৬-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফারহান মাঠে নামেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তিনিই বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোল করেন। 

অবশ্যই একজন বদলি খেলোয়াড় পরে গোল করলেই বলা যায় না যে তাকে শুরুতে খেলালে ম্যাচের ফল বদলে যেত। কিন্তু এত বড় ব্যবধানে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার পর কেন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের আরও আগে ব্যবহার করা হলো না—এই প্রশ্ন উঠতেই পারে।

বিশেষ করে যখন পুরো টুর্নামেন্টে দল কাঙ্ক্ষিত আক্রমণাত্মক ধার দেখাতে পারেনি।

‘পছন্দের খেলোয়াড়’ নিয়ে যে প্রশ্ন, উত্তর দেবে কে? বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়—দল নির্বাচনে কি সব খেলোয়াড়ের জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য?এই প্রশ্নের উত্তর কোচ ও ম্যানেজমেন্টকেই দিতে হবে।

কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া ‘নির্ধারিত খেলোয়াড়’ বা ‘পছন্দের খেলোয়াড়’ তকমা দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, যোগ্যতা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দল নির্বাচন হচ্ছে কি না—সেটি পরিষ্কার থাকা জরুরি।

জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার জন্য যদি একজনকে পারফর্ম করতে হয়, অথচ অন্য কারও জায়গা প্রায় নিশ্চিত থাকে—তাহলে দলের ভেতরের প্রতিযোগিতাই নষ্ট হয়ে যায়।

টুর্নামেন্টের আগেই ম্যানেজমেন্ট নিয়ে নাটক! এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টুর্নামেন্টের আগেই জাতীয় দলের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।

ক্যাম্প শুরুর দুই দিন পরই আমিরুল ইসলাম বাবুকে নতুন টিম ম্যানেজার করা হয়। এর আগে আমের খান প্রথম দুই দিন ক্যাম্প তদারক করেছিলেন এবং পরে টিম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে থাকেন। একই সময়ে ইকবাল হোসেনকে টিম লিডার করা হয়। 

অর্থাৎ টুর্নামেন্ট সামনে রেখে ম্যানেজার, টিম ম্যানেজার, টিম লিডার, কো-অর্ডিনেটর—বিভিন্ন দায়িত্ব ও পদ নিয়ে যে টানাপোড়েন এবং পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটি মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না।

জাতীয় দলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল প্রস্তুতি, কৌশল, খেলোয়াড় নির্বাচন ও প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, সেখানে ম্যানেজমেন্ট কাঠামো নিয়েই যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আরও বড় প্রশ্ন—এত বড় বহর, এত কর্মকর্তা, এত ব্যবস্থাপনা; কিন্তু মাঠের প্রস্তুতি ও দলীয় পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন কোথায়?

টুর্নামেন্টের আগে ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে পরিমাণ আলোচনা ও নাটক হয়েছে, মাঠের ফুটবল নিয়ে ততটা স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান প্রস্তুতি কি দেখা গেছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তিন ম্যাচে তিন হার—দায় কার?

মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০, সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ এবং এবার ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২। তিন ম্যাচে বাংলাদেশের গোল ২টি, বিপরীতে হজম করেছে ১৩টি। 

এমন পরিসংখ্যানের পর শুধু খেলোয়াড়দের দায়ী করে পার পাওয়া সহজ। কিন্তু জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ডুলির সিদ্ধান্তও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ডুলি নিজেও এর আগে বাংলাদেশের সীমিত প্রস্তুতির কথা বলেছেন। টুর্নামেন্টের আগে তিনি বলেছিলেন, দল দীর্ঘ সময় ম্যাচের বাইরে ছিল এবং প্রস্তুতির জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় পেয়েছে। 

সেই বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। কিন্তু প্রস্তুতি কম থাকা একটি ব্যাখ্যা হতে পারে; ৯ গোল হজমের পূর্ণ উত্তর নয়।

দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ যে সামলাতে পেরেছিল, সেটাই আরও প্রশ্ন বাড়ায়

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, ৬-১ পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের বড় অংশে বাংলাদেশ আর গোল খায়নি। বরং শেষদিকে গিয়ে আবার তিন গোল হজম করে। ৯০ মিনিটে সপ্তম, ৯০+১ মিনিটে ফারহানের দ্বিতীয় গোল, এরপর ৯০+৬ ও ৯০+৭ মিনিটে আরও দুই গোল। 

এতে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ পুরো ৯০ মিনিট একইভাবে অসহায় ছিল না।

তাহলে প্রথমার্ধে সেই সংগঠন কোথায় ছিল? কেন শুরু থেকেই একই ধরনের রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা দেখা গেল না? কেন প্রতিপক্ষের আক্রমণের ধরন বুঝেও কার্যকর সমাধান বের করা গেল না?

ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী দল—এটা বাস্তবতা। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সি পরে ৯ গোল হজম করার পর শুধু প্রতিপক্ষের শক্তির কথা বলে আলোচনার শেষ টানা যায় না।

ডুলিকে তার কৌশল ও দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ম্যানেজমেন্টকে দিতে হবে প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জবাব। আর ফুটবল ফেডারেশনকে দেখতে হবে, জাতীয় দলের চারপাশে এত পদ-পদবি ও ব্যবস্থাপনার পর মাঠের ফল কেন এতটা বিপরীতমুখী।

জাতীয় দল কোনো ব্যক্তির পছন্দের দল নয়। এখানে নাম, সম্পর্ক কিংবা পরিচয়ের চেয়ে বর্তমান পারফরম্যান্স, যোগ্যতা ও দলের প্রয়োজন—এই তিনটিই হওয়া উচিত মূল মানদণ্ড।

ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ তাই শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় দলের কোচিং পরিকল্পনা, খেলোয়াড় নির্বাচন এবং ম্যানেজমেন্ট কাঠামো—তিন জায়গাতেই নতুন করে হিসাব চাওয়ার মুহূর্ত।

মাঠে ৯ গোলের ধাক্কা; এখন মাঠের বাইরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পালা।

এসআর

সম্পর্কিত খবর