[email protected] রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
১ ভাদ্র ১৪৩৩

মিরাজ-হাসানের বোলিংয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বধ

বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টাইগারদের ইতিহাস

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ১৬ আগষ্ট ২০২৬ ১২:৫০ পিএম

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। অপেক্ষাটা দীর্ঘ ছিল, কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রতিদান মিলল ইতিহাস গড়া এক জয়ে। ডারউইনে প্রথম টেস্টে বিশ্ব টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।

চার দিনের লড়াইয়ে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ইনিংসে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, শান্তর ৮৪ ও মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের পর বল হাতে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের পাঁচ উইকেট—সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী দলকে কোনো পর্যায়েই স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি বাংলাদেশ।

শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৭ রান। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম শূন্য রানে ফিরলেও মুমিনুল হক ও শাদমান ইসলাম আর কোনো বিপদ হতে দেননি। মুমিনুল অপরাজিত ছিলেন ৩০ রানে, শাদমানও দলকে নিরাপদে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ৫৭ রান তুলে ৯ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হয়ে থাকল ডারউইনের এই ম্যাচ।

মিরাজের ঘূর্ণিতে শেষ অস্ট্রেলিয়া : চতুর্থ দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া ছিল ৬ উইকেট হাতে নিয়ে। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ২২৮ রানের লিড মুছে ফেলার দায়িত্ব ছিল স্বাগতিকদের সামনে। এক প্রান্তে দৃঢ়ভাবে ব্যাট করছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। আগের দিনের ৮৫ রানে অপরাজিত থাকা এই ব্যাটারই অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর সবচেয়ে বড় আশা হয়ে ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ সেই সুযোগ দেয়নি।

মেহেদী হাসান মিরাজ একে একে ফিরিয়ে দেন অ্যালেক্স ক্যারি ও বিউ ওয়েবস্টারকে। ক্যারি সামনে এসে বল ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মিরাজের বল ব্যাটের বাইরের কিনারা ছুঁয়ে যায়। ওয়েবস্টারও বলের লাইনে ভুল করে বোল্ড হন।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডার। প্যাট কামিন্স মিরাজের বলে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। অন্য প্রান্তে গ্রিন চেষ্টা চালিয়ে যান অস্ট্রেলিয়াকে বড় লিড এনে দিতে। মিচেল স্টার্কের সঙ্গে ৪৩ রানের জুটি গড়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছিলেন গ্রিন। কিন্তু সেই জুটিও ভাঙেন তাসকিন আহমেদ। স্টার্কের ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটরক্ষকের হাতে। গ্রিন অবশ্য নিজের লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ করেন টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি। ১০৪ রানের ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা লিড এনে দিলেও সেটি বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

হাসান মাহমুদের বলে নিজের স্টাম্পে বল টেনে এনে আউট হন গ্রিন। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়া হাসান দ্বিতীয় ইনিংসে আরও তিনটি উইকেট নিয়ে ম্যাচে মোট ৯ উইকেটের মালিক হন। ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে। আর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ করেন মিরাজ। নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে নিজের ১৫তম টেস্ট পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭।

মিরাজের আগে হাসানের ঝড়: বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ম্যাচের প্রথম দিনেই। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের পেসারদের। হাসান মাহমুদ একাই নেন ছয় উইকেট। তাঁর সঙ্গে অন্য পেসাররাও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে রাখেন। বাংলাদেশের পেস আক্রমণ প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেটই তুলে নেয়।

এরপর ব্যাট হাতে বাংলাদেশের বড় লিডের ভিত গড়ে দেন তানজিদ হাসান তামিম। নিজের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি করেন এই ওপেনার। তাঁর ১০১ রানের ইনিংসের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মিরাজের ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জশ হ্যাজেলউড নেন ৬ উইকেট, কিন্তু বাংলাদেশের লিড থামাতে পারেননি। বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রানে। সেখান থেকেই ম্যাচে বড় সুবিধা পেয়ে যায় সফরকারীরা।

২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের মাত্র তৃতীয় টেস্ট। আগের দুই ম্যাচে জয় তো দূরের কথা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের ঘরের মাঠে টেস্ট জয়ের কোনো ইতিহাসই ছিল না। এবার সেই অপেক্ষার অবসান হলো ডারউইনে। বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষে এই জয়কে সরাসরি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘সবচেয়ে বড় জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শান্ত বলেন, “এটি যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।” বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে এমন জয় যে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, শান্তর কথাতেই সেটি স্পষ্ট।

বদলে গেছে বাংলাদেশের টেস্ট মানসিকতা: শান্ত বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশের পেস বোলারদের। তাঁর মতে, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পেস বোলিংয়ে। শান্ত জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগেও বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেট খেলার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ায় পেসারদের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন তাঁরা টেস্ট ক্রিকেটে খেলতে চান, ভালো করতে চান এবং বিশ্বমানের হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছেন।

এ ক্ষেত্রে সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো ক্রিকেটাররা তরুণদের টেস্ট ক্রিকেটে আরও বেশি মনোযোগী হতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

তানজিদের সেঞ্চুরিও বদলে দিয়েছে ম্যাচ: মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি বাংলাদেশের জয়ের ভিত আরও শক্ত করে।শান্তর চোখে তানজিদের এই ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর ধৈর্য। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত তানজিদ এবার টেস্টে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করেছেন।

শান্ত বলেন, তানজিদ জানেন কীভাবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হয়, কিন্তু এই ম্যাচে তিনি অনেক বেশি শান্ত ছিলেন এবং বলের মেরিট অনুযায়ী খেলেছেন। দলের টপ অর্ডারে এমন একজন ব্যাটারের কাছ থেকে প্রভাবশালী ইনিংস চেয়েছিলেন তাঁরা, আর তানজিদ সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

ম্যাচসেরা হাসানের মন্ত্র ছিল প্রক্রিয়ায় আস্থা: ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়া হাসান মাহমুদও এই জয়ের পেছনে দলীয় পরিকল্পনা ও ধৈর্যকে বড় করে দেখেছেন। তিনি জানান, ম্যাচের আগে প্রতিটি অনুশীলন সেশনে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। ফলাফল কী হবে, সেটির চেয়ে নিজেদের প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ দিন ধরে ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল করা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার ফলই এসেছে বলে মনে করেন হাসান।

২-০-এর সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ। প্রথম টেস্ট জিতে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ফলে সিরিজ এখন হাতছানি দিচ্ছে সফরকারীদের সামনে। দ্বিতীয় টেস্ট হবে ম্যাকে। সেখানে সিরিজ জয়ের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

তবে শান্ত বাস্তবতা ভুলছেন না। তিনি জানিয়েছেন, ডারউইনের এই জয় বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাস দেবে ঠিকই, কিন্তু ম্যাকেতে আবারও ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। পাঁচ দিন ধরে ধাপে ধাপে নিজেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এগোতে হবে।

তাঁর ভাষায়, প্রথম টেস্টে বোলাররা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন, ব্যাটাররা অবদান রেখেছেন এবং লোয়ার মিডল অর্ডার ও লোয়ার অর্ডারের ব্যাটিংও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরের ম্যাচেও একইভাবে খেলতে হবে।

বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ইনিংসে তানজিদ হাসান তামিম ১০১, নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫ রান করেন। বল হাতে প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ ৫ উইকেট নেন। হাসান ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে সর্বোচ্চ ১০৪ রান করেন ক্যামেরন গ্রিন। তবে তাঁর সেঞ্চুরিও অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরাতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় বাংলাদেশের। ডারউইনের এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডে ৯ উইকেটের ব্যবধান নয়—বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের বদলে যাওয়া মানসিকতা, পেস বোলিংয়ের উন্নতি এবং চাপের মধ্যে দলীয় পারফরম্যান্সেরও বড় প্রমাণ হয়ে থাকল।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় এক নজরে : অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪, বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ৫৭/১,

ম্যাচ ফলাফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী,  সিরিজ: বাংলাদেশ এগিয়ে ১-০

এসআর

সম্পর্কিত খবর