[email protected] মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

বিশ্ব ফুটবলে অপ্রতিরোধ্য স্পেন: পাঁচ বছরে ১৬ শিরোপা জিতে অনন্য উচ্চতায় লা রোহা

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬ ১২:৩২ পিএম

সংগৃহীত ছবি

বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে স্পেনের সাফল্যের জয়রথ যেন থামছেই না। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ,

 নেশনস লিগ ও অলিম্পিকের পর এবার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল লা রোহা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে স্পেন। এই অবিস্মরণীয় জয়ের মধ্য দিয়ে স্প্যানিশরা প্রমাণ করেছে, বর্তমান ফুটবল বিশ্বে তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী দল।

​এই গৌরবময় অর্জনের মাধ্যমে স্পেন তাদের ২০১০ সালের সোনালী স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ২০০৮ সালে ইউরো জেতার পর ২০১০ সালে যেমন তারা বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ২০২৬ সালে এসে আবারও বিশ্বসেরার মুকুট পরল তারা। তবে এবারের প্রাপ্তিটি আরও বেশি ঐতিহাসিক, কারণ ফুটবল ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী—উভয় বিভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা ধরে রাখার অনন্য রেকর্ড গড়ল স্পেন।

​২০২৩ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের নারী দল বিশ্বজয়ের যে সূচনা করেছিল, পুরুষ দল ২০২৬ সালে এসে সেই সাফল্যকে পূর্ণতা দিল। এর পাশাপাশি পুরুষ দল ২০২৩ সালে উয়েফা নেশনস লিগ এবং ২০২৪ সালে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক জিতেছে। অন্যদিকে, স্পেনের নারী ফুটবল দলও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগের শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে।

​গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বয়সভিত্তিক থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত স্পেনের আধিপত্য এককথায় ঈর্ষণীয়। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান ফুটবলে তারা মোট ১৬টি শিরোপা জিতেছে। অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩ এবং সিনিয়র—প্রতিটি স্তরেই স্প্যানিশদের এই ধারাবাহিক জয়জয়কার প্রমাণ করে যে, দেশটির ফুটবল কাঠামো কতটা শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

​স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিয়েম বালাগের মতে, এটি কেবল কিছু ট্রফি জেতার গল্প নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলে একটি দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ। স্পেনে এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে খেলোয়াড়, কোচ ও ফুটবল ফেডারেশন একই দর্শনে কাজ করে। তাই একটি লক্ষ্য অর্জনের পর তারা থেমে না গিয়ে নতুন লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

​এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনের মূল কারিগর জাতীয় দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন তিনি দায়িত্ব নেন, তখন বড় কোনো ক্লাবের কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকেই একে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ভেবেছিলেন। তবে ২০২৩ সালে নেশনস লিগ, ২০২৪ সালে ইউরো এবং ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ জিতিয়ে তিনি সব সমালোচনার মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। বয়সভিত্তিক ও অলিম্পিক দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করায় বর্তমান জাতীয় দলের অধিকাংশ ফুটবলারের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল দারুণ। স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতার মতে, এই ধারাবাহিকতাই দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

​বর্তমানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে স্পেন। ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো জাতীয় দল এর আগে এত দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকতে পারেনি। মাঠে বলের দখল রাখা, আক্রমণ সাজানো আর রক্ষণভাগের শৃঙ্খলায় স্পেন এখন বিশ্ব ফুটবলের রোল মডেল।

​নারী ফুটবলেও গত এক দশকে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একসময়ের সুযোগ-সুবিধার অভাব কাটিয়ে এখন সেখানে গড়ে উঠেছে উন্নত একাডেমি ও পেশাদার অবকাঠামো। সাবেক ফুটবলার মারিয়া গারিদোর মতে, সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার ফলেই নারী দল আজ বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করছে।

​লামিন ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, ভিকি লোপেজ ও সালমা পারাইয়ুয়েলোর মতো তরুণ তুর্কিরা ইতোমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন। ইয়ামাল ও কুবারসি তো বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেই ইতিহাস গড়েছেন, যা স্পেনের ভবিষ্যতের শক্তিমত্তারই জানান দেয়।

​ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট এবং ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির মতো ফুটবল ব্যক্তিত্বদের মতে, স্পেনের বর্তমান ফুটবল শৈলীর ধারেকাছেও বিশ্বের অন্য কোনো দল নেই। এই সাফল্য কেবল প্রতিভার জোরে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শক্তিশালী কাঠামোর ফসল। আর এ কারণেই বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের এই সাম্রাজ্য আরও বহু বছর টিকে থাকবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।

এসআর

সম্পর্কিত খবর