আরেকটি রোমাঞ্চকর ও রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা
করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ছিয়াশি থেকে ছাব্বিশ— দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবধানে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আলবিসেলেস্তেদের জয়ের ঝাণ্ডা এখন লিওনেল মেসির হাতে। ম্যাচে নিজে গোল না পেলেও দলের জয়সূচক দুটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখেছেন এই মহাতারকা। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে হারানোর পর, বিশেষ এই জয়টি প্রয়াত কিংবদন্তি দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাকে উৎসর্গ করেছেন মেসি।
ম্যারাডোনার স্মৃতি ও ফকল্যান্ডস যুদ্ধের আবহ
ঠিক ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স আজও ফুটবল ইতিহাসের সেরা অধ্যায় হয়ে আছে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত আর্জেন্টিনার মানুষের মনে সেই জয় এনে দিয়েছিল গভীর প্রশান্তি।
দীর্ঘ ৪৪ বছর পর বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে সেই যুদ্ধের আবেগ হুবহু এক না হলেও, ম্যাচ শেষে তারা ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার নিয়ে উদযাপন করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচটি তাই তাদের কাছে শুধু সেমিফাইনাল ছিল না, ছিল এক বাড়তি অনুপ্রেরণার লড়াই।
খেলা শেষে টিওয়াইসি স্পোর্টসের সাংবাদিক মাতিয়াস পেলিচিওনি মেসির হাতে ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সির একটি প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) তুলে দেন। আবেগঘন কণ্ঠে মেসি বলেন:
"নিঃসন্দেহে ওপর থেকে দিয়েগো এটা দারুণভাবে উপভোগ করছে। কারণ আজকের দিনটা তার জন্য খুবই বিশেষ ছিল। তাকে এই আনন্দটা দিতে পেরে ভালো লাগছে। ওপর থেকে যেভাবেই দেখুক, উপভোগ করুক। এটাও ওর জন্য একটা উপহার।"
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও আজতেকা স্টেডিয়ামের সেই পাঁচ মিনিট
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ম্যারাডোনা নিজেকে কিংবদন্তির আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ৫০তম মিনিটে পিটার শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে হাত দিয়ে করা গোলটি ইতিহাসে 'হ্যান্ড অব গড' নামে অমর হয়ে আছে। এর ঠিক পরেই একের পর এক ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ও জাদুকরী গোলটি করেছিলেন তিনি।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দর্শকদের মুখে এখন একটাই স্লোগান— "ফকল্যান্ডসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, আর লিওর শেষ বিশ্বকাপের জন্য।" আটলান্টার এই মহাকাব্যিক বিকেলে প্রথম দুটি আবেগের প্রতিফলন মাঠেই দেখা গেছে।
মেসির সামনে রেকর্ডের হাতছানি ও ফাইনালের মহাদ্বৈরথ
ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়ামের আবেগ নিয়ে মেসি বলেন, জাতীয় সংগীতের সময় দর্শকদের গুঞ্জন ও আবেগ তাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তারা জানতেন এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ, তবুও আবেগ ধরে রাখা কঠিন ছিল।
এই জয়ের মাধ্যমে লিওনেল মেসি বেশ কয়েকটি নতুন রেকর্ড নিজের নামে লিখেছেন:
কাফুর রেকর্ডের সমতা: আগামী রোববার দিবাগত রাতে নিউজার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে নিজের ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে নামবেন মেসি, যা তাকে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর রেকর্ডের সমতায় নিয়ে যাবে।
সর্বোচ্চ গোলদাতার ব্যবধান: বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে কিলিয়ান এমবাপের ওপর নিজের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে তার সামনে।
দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার লক্ষ্য: ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে নিজের অনন্য অর্জনের ভাণ্ডারকে পূর্ণতা দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন এই মহাতারকা।
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের স্বপ্ন পূরণের শেষ ধাপটি অর্জিত হবে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর মিলবে আগামী রোববারের হাইভোল্টেজ ফাইনালে।
এসআর