[email protected] শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
১২ আষাঢ় ১৪৩৩

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

জার্মানির প্রথম হার; ইকুয়েডরের ঐতিহাসিক জয়ে শেষ বত্রিশ নিশ্চত

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০২৬ ৫:২১ এএম

বিশ্বকাপ মানেই অঘটনের জন্ম, রূপকথার গল্প আর অসম্ভবকে সম্ভব করার মঞ্চ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই তালিকায় নতুন অধ্যায় যোগ করল ইকুয়েডর।

বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না তাদের সামনে। প্রতিপক্ষ আবার চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, যারা আগের দুই ম্যাচ জিতে আগেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছিল।

কিন্তু ফুটবল যে কাগজের হিসাব মানে না, সেটাই আরও একবার প্রমাণ করল সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের দল। নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘গ্রুপ ই’-এর শেষ ম্যাচে এক গোলে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়েছে ইকুয়েডর। এই জয়ে শুধু তিন পয়েন্টই নয়, ২০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে লাতিন আমেরিকার দেশটি।

ইকুয়েডরের জয়ের নায়ক গনজালো প্লাতা। ম্যাচের ৭৮তম মিনিটে তাঁর করা গোলই ইতিহাস লিখে দেয়। একই সময়ে অন্য ম্যাচে আইভরি কোস্ট ২-০ ব্যবধানে কুরাসাওকে হারানোয় সেরা তৃতীয় স্থান পাওয়া দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা নিশ্চিত হয় ইকুয়েডরের।

শুরুতেই সানের আঘাতে স্তব্ধ ইকুয়েডর, ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের আধিপত্য দেখাতে শুরু করে জার্মানি। খেলা শুরুর মাত্র ১০৯ সেকেন্ডেই আসে প্রথম গোল। ফ্লোরিয়ান উইর্টজের দারুণ পাস থেকে বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জার্মানিকে এগিয়ে দেন লেরয় সানে।

দেশের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এটি ছিল সানের প্রথম গোল। দ্রুত গোল করে জার্মানি যেন আরও একটি বড় জয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল তখন টানা ১২তম আন্তর্জাতিক জয় এবং ২০০৬ সালের পর প্রথমবার গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল।

মাত্র সাত মিনিটেই জবাব ইকুয়েডর। গোল হজম করেও ভেঙে পড়েনি ইকুয়েডর। বরং আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় তারা। ম্যাচের নবম মিনিটে প্রায় ২৪২ মিনিটের বিশ্বকাপ গোলখরা কাটান নিলসন আঙ্গুলো। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর বাঁকানো শট জার্মান ডিফেন্ডার আলেক্সান্দার পাভলোভিচের পায়ের ফাঁক দিয়ে গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়।

গোলটি শুধু ম্যাচে সমতাই ফেরায়নি, পুরো স্টেডিয়ামের আবহও বদলে দেয়। আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় ইকুয়েডর, আর কিছুটা চাপে পড়ে জার্মানি।

নয়ারের রেকর্ডের দিনেও হতাশা থেকেই গেলো জার্মানির। এই ম্যাচে মাঠে নেমে জার্মান কিংবদন্তি ম্যানুয়েল নয়ার বিশ্বকাপে ২২তম ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলে লোথার ম্যাথাউস ও মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ড স্পর্শ করেন। তবে ব্যক্তিগত এই অর্জনের দিনে দলকে পরাজয় এড়াতে পারেননি তিনি। পাশাপাশি জার্মানি টানা নবম ম্যাচেও ক্লিন শিট রাখতে ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কাই হাভার্টজকে ফাউল করার অভিযোগে জার্মানির পক্ষে পেনাল্টি দেন রেফারি। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আক্রমণ শুরুর সময় লেরয় সানেই ইকুয়েডরের পেদ্রো ভিতেকে ফাউল করেছিলেন। ফলে বাতিল হয়ে যায় পেনাল্টির সিদ্ধান্ত।

এরপর ম্যাচের ৬৪তম মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন ইকুয়েডর কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে। অভিজ্ঞ অধিনায়ক এনার ভ্যালেন্সিয়াকে তুলে বদলি হিসেবে মাঠে নামান কেভিন রদ্রিগেসকে।

প্রথমে এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হন সমর্থকেরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বদলিই হয়ে ওঠে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। প্লাতার পায়ে ইতিহাস লিখলো ইকুয়েডর। ম্যাচের ৭৮তম মিনিটে কর্নার থেকে ভেসে আসা বল হেডে বাড়িয়ে দেন বদলি খেলোয়াড় কেভিন রদ্রিগেস। সুযোগ বুঝে দ্রুত বলের নিয়ন্ত্রণ নেন গনজালো প্লাতা।

নয়ার প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই কাছ থেকে জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ইকুয়েডরের বেঞ্চ ও গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো সমর্থক। এই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

শেষ মুহূর্তেও ফিরতে পারেনি জার্মানি। গোল হজমের পর সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে জার্মানি। শেষ দিকে দেনিজ উনদাভের একটি শট অল্পের জন্য সাইডনেটে লাগে। এরপর একাধিক আক্রমণ করেও ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি ইউরোপের পরাশক্তিরা।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠে ইকুয়েডর। ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে তারা। পাশাপাশি ২০১৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দেখাল লাতিন আমেরিকার দলটি।

অন্যদিকে, পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ নিয়েও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই শেষ বত্রিশে উঠেছে জার্মানি। তবে রক্ষণভাগের দুর্বলতা ও সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা নিয়ে নকআউট পর্বের আগে নতুন করে ভাবতে হবে ইউলিয়ান নাগেলসম্যানকে।

শেষ বত্রিশে ইকুয়েডরের প্রতিপক্ষ হতে পারে শক্তিশালী ইংল্যান্ড। জার্মানিকে হারানোর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেই লড়াইয়েও চমক দেখানোর স্বপ্ন দেখছে লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিরা।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর