[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩

১১০ বিলিয়ন সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্টে নতুন রেকর্ড

রেকর্ড ভেঙে নতুন যুগের সূচনা; মিলানো কর্তিনা অলিম্পিকে ডিজিটাল বিপ্লব

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০২৬ ২:৩৬ পিএম

শুধু বরফের মাঠে নয়, ডিজিটাল জগতেও ইতিহাস গড়ে শেষ হয়েছে মিলানো কর্তিনা ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিক। সম্প্রচার, স্ট্রিমিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দর্শক সম্পৃক্ততা এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রায় সব সূচকেই অতীতের রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে ইতালিতে আয়োজিত এবারের অলিম্পিক।

সুইজারল্যান্ডের লুসানে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (IOC) ১৪৬তম অধিবেশনে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। বিশ্বের ১৫টি দেশের ৬০ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, শীতকালীন অলিম্পিকের প্রতি আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইওসি সভাপতি Kirsty Coventry বলেন, “মিলানো কর্তিনা ২০২৬ দেখিয়ে দিয়েছে অলিম্পিকের আবেদন কতটা সর্বজনীন ও চিরন্তন। কোটি কোটি মানুষ সম্প্রচার, স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের গল্প, সংগ্রাম ও সাফল্যের অংশীদার হয়েছেন। এই গেমস আবারও প্রমাণ করেছে—মানুষকে একত্রিত করার শক্তি অলিম্পিকের মতো আর কোনো বৈশ্বিক আয়োজনের নেই।”

ডিজিটাল যুগে অলিম্পিক দেখার নতুন ধারা। গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দর্শকদের খেলা দেখার অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালের বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকে যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ দর্শক পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করেছিলেন, সেখানে মিলানো কর্তিনা ২০২৬-এ সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে।

অন্যদিকে ৬০ শতাংশ দর্শক একই সঙ্গে টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অলিম্পিক উপভোগ করেছেন। ফলে মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম কনটেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা এবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। টেলিভিশনে দর্শকদের গড় দেখার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একজন দর্শক গড়ে ৬.৯ ঘণ্টা অলিম্পিক দেখেছেন, যা বেইজিং ২০২২-এর ৬.১ ঘণ্টা এবং পিয়ংচ্যাং ২০১৮-এর ৫.৬ ঘণ্টার তুলনায় অনেক বেশি।

মিলানো কর্তিনা অলিম্পিকের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গবেষণা সংস্থা নিলসেন এবং পাবলিসিস স্পোর্ট অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্টের জরিপ অনুযায়ী, অলিম্পিক চলাকালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১০ বিলিয়ন (১১ হাজার কোটি) সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্ট রেকর্ড করা হয়েছে।

এ ছাড়া গুগলসহ বিভিন্ন সার্চ প্ল্যাটফর্মে অলিম্পিক-সংক্রান্ত অনুসন্ধান ছিল বেইজিং ২০২২-এর তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। আইওসি’র ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাসিক ব্যবহারকারী সংখ্যা ৬ কোটি ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৩০ লাখে। একই সময়ে আইওসি’র নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনগেজমেন্ট ৩.২ বিলিয়ন থেকে লাফিয়ে ১২.৭ বিলিয়নে পৌঁছেছে।

শুধু অনলাইন নয়, মাঠেও ছিল দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি। স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং অলিম্পিক টর্চ রিলে মিলিয়ে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সরাসরি এই আয়োজনের অংশ হয়েছেন। টিকিটধারীদের ৮৫ শতাংশ তাঁদের অভিজ্ঞতাকে ‘চমৎকার’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। স্বাগতিক ইতালির নাগরিকদের মধ্যে এই সন্তুষ্টির হার ছিল ৯২ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ ইতালীয় মনে করেন, এই অলিম্পিক তাদের অঞ্চল ও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রেখে যাবে।

মিলানো কর্তিনা অলিম্পিক শুধু দর্শকদের নয়, খেলোয়াড়দের কাছেও হয়ে উঠেছে স্মরণীয়। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন অ্যাথলেটের মধ্যে ৯ জন জানিয়েছেন, এই অলিম্পিকে অংশ নেওয়া তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। ৯২ শতাংশ অ্যাথলেট বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলোয়াড়দের এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ অলিম্পিক আয়োজনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান বিভাজনের প্রেক্ষাপটে অলিম্পিকের সামাজিক গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে অলিম্পিকের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ৭৯ শতাংশ বিশ্বাস করেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করতে আইওসি সফল হয়েছে। আর ৭৭ শতাংশের মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে আরও সুন্দর ও সহনশীল পৃথিবী গঠনে অলিম্পিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বরফের মাঠে পদকজয়ীদের লড়াইয়ের পাশাপাশি দর্শক সম্পৃক্ততা, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে নতুন এক মানদণ্ড স্থাপন করেছে মিলানো কর্তিনা ২০২৬। সংখ্যার বিচারে এটি শুধু একটি সফল শীতকালীন অলিম্পিক নয়; বরং আধুনিক ডিজিটাল যুগে অলিম্পিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর