নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের মূল পর্বে এর আগে কখনো জয়ের দেখা পায়নি কানাডা। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো ঘরের মাঠেই। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে ৫২ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে দুর্দান্ত এক প্রদর্শনীতে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতারকে ৬-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নিয়েছে সহ-আয়োজক দেশটি।
বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচে কানাডার জয়ের নায়ক ছিলেন তারকা ফরোয়ার্ড জনাথন ডেভিড। জুভেন্টাসে খেলা এই স্ট্রাইকার হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের চলতি আসরের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উপহার দেন। একটি করে গোল করেন সাইল লারিন ও নাথান-ডিলান সালিবা। অন্য গোলটি আসে কাতারের আত্মঘাতী ভুলে।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কানাডা। গ্যালারিভর্তি সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিপক্ষের ওপর একের পর এক আক্রমণ চালায় জেসি মার্শের দল। ম্যাচের ১৬তম মিনিটে তার ফলও পেয়ে যায় তারা। কাতারের ডিফেন্ডারদের ভুলে বল পেয়ে সাইল লারিন সহজ ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
প্রথম গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে কানাডা। ২৯তম মিনিটে আসে ম্যাচের অন্যতম সেরা গোল। তাজন বুকাননের শট প্রতিহত হওয়ার পর বাতাসে ভাসতে থাকা বল ড্রপ খাওয়ার আগেই অসাধারণ ভলিতে জালে পাঠান জনাথন ডেভিড। তাতে ব্যবধান হয় ২-০।
চার মিনিট পরই ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায় কাতার। বুকানন এককভাবে গোলের দিকে এগিয়ে গেলে তাকে পিছন থেকে ফাউল করেন ডিফেন্ডার হোমাম আল-আমিন। ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। ১০ জনের দলে পরিণত হয় কাতার।
একজন কম নিয়ে খেলতে থাকা দলটি বিরতির আগেই আরও বড় ধাক্কা খায়। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে লারিনের হেড ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে গোল করে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন ডেভিড। ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় কানাডা।
দ্বিতীয়ার্ধে কাতারের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। ৫৪তম মিনিটে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা। কানাডার মিডফিল্ডার ইসমায়েল কোনের ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করেন আসিম মাদিবো। আঘাতে কোনে গুরুতর চোট পান এবং মাঠেই চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। ভিএআর পর্যালোচনার পর মাদিবোকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হলে ৯ জনের দলে পরিণত হয় কাতার।
চোট পাওয়া কোনেকে স্ট্রেচারে মাঠের বাইরে নেওয়ার সময় পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালি দেয়। কানাডার খেলোয়াড়রাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এরপর আর ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগ পায়নি কাতার। ৬৪তম মিনিটে কোনের বদলি হিসেবে নামা নাথান-ডিলান সালিবা দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে স্কোরলাইন ৪-০ করেন। গোলের পর দুই হাত দিয়ে সতীর্থ কোনের জার্সি নম্বর ‘৮’ প্রদর্শন করে তাকে উৎসর্গ করেন এই গোল।
৭৫তম মিনিটে কানাডার আরেক আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে বসেন কাতারের ডিফেন্ডার মোহাম্মদ মানাই। তাতে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-০।
তবে কানাডার গোল উৎসব তখনও শেষ হয়নি। ম্যাচের যোগ করা সময়ে সালিবার পাস থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন জনাথন ডেভিড। একই সঙ্গে কানাডার ৬-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়ও নিশ্চিত হয়।
এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণ তিন পয়েন্ট পেল কানাডা। শুধু জয়ই নয়, ছয় গোলের বিশাল ব্যবধান তাদের গ্রুপের শীর্ষে ওঠার পথও সহজ করেছে। একই গ্রুপের অন্য ম্যাচে সুইজারল্যান্ড ৪-১ গোলে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে হারানোয় পরবর্তী ম্যাচগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, টানা দুই লাল কার্ড, ছয় গোল হজম এবং হতাশাজনক পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের শঙ্কায় পড়ে গেছে কাতার। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও কানাডার বিপক্ষে তারা ছিল সম্পূর্ণ অসহায়।
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের এমন এক রাতে কানাডা শুধু তিন পয়েন্টই পায়নি, লিখেছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন জনাথন ডেভিড, যার হ্যাটট্রিকের রাত বহুদিন মনে রাখবে কানাডিয়ান ফুটবল।
এসআর