দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে ইতিহাস গড়ার হাতছানি ছিল বাংলাদেশের সামনে। টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে অনন্য এক হ্যাটট্রিক শিরোপা অর্জনের সুযোগ ছিল লাল-সবুজের মেয়েদের।
তবে গোয়ার ফাইনালে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে সাহসী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেও শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলে হার মানতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শিরোপা হাতছাড়া হলেও পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরম্যান্স এবং ফাইনালে লড়াকু মনোভাব দেশের নারী ফুটবলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিয়েছে।
গোয়ার পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তিশালী দল বাংলাদেশ ও ভারত। একদিকে ছিল টানা দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ, অন্যদিকে নিজেদের মাঠে ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে থাকা ভারত।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে খেলতে নামে বাংলাদেশ। কোচ পিটার বাটলারের কৌশলে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে দারুণ সমন্বয় দেখা যায়। গ্রুপ পর্বে যে বাংলাদেশকে কিছুটা ছন্দহীন মনে হয়েছিল, ফাইনালে সেই দলকেই দেখা গেছে আত্মবিশ্বাসী, আক্রমণপ্রবণ এবং জয়ের জন্য মরিয়া রূপে।
প্রথমার্ধের শুরুতেই কয়েকবার ভারতের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের মেয়েরা। ১২ মিনিটে তহুরা খাতুন গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও সফল হতে পারেননি। মাত্র দুই মিনিট পর আবারও গোলের সুযোগ আসে তার সামনে, কিন্তু সেবারও বল জালে পাঠাতে ব্যর্থ হন এই ফরোয়ার্ড। দুই সুযোগ হাতছাড়া না হলে ম্যাচের গতিপথ শুরুতেই বাংলাদেশের পক্ষে চলে যেতে পারত।
বাংলাদেশের আক্রমণ অব্যাহত থাকে পুরো প্রথমার্ধজুড়ে। ৪১ মিনিটে আরও একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়। তবে শটটি অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। সুযোগ নষ্টের মাশুল দিতে হয় পরের মিনিটেই।
ম্যাচের ৪২ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে ভারতের পেয়ারি সাসা গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন। হঠাৎ পিছিয়ে পড়লেও ভেঙে পড়েনি বাংলাদেশ। বরং গোল শোধে আরও মরিয়া হয়ে ওঠে দল।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। তহুরা খাতুনের চমৎকার পাস থেকে ঋতুপর্ণা চাকমা দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান। বাংলাদেশের সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। ১-১ সমতায় প্রথমার্ধ শেষ করে বিরতিতে যায় দুই দল।
বিরতির পর ম্যাচে ফেরে ভারত আরও আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র এক মিনিটের মাথায় সানফিদার হেড থেকে গোল পেয়ে আবারও এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এই গোল বাংলাদেশের পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়।
তবে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ৫১ মিনিটে শামসুন্নাহার জুনিয়রের হেড অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। এরপর ঋতুপর্ণা, সাগরিকা ও তহুরাদের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ শানায় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশের সমতায় ফেরার পথ রুদ্ধ করে দেয়।
ম্যাচের সময় যত গড়িয়েছে, বাংলাদেশ তত বেশি আক্রমণে মনোযোগী হয়েছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমণে ভারতের খেলোয়াড়রা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ম্যাচের ৮১ মিনিটে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে লিন্ডাকম গোল করলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-১। কার্যত তখনই বাংলাদেশের হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে যায়।
শেষ কয়েক মিনিটে সাগরিকা ও তার সতীর্থরা মরিয়া চেষ্টা চালালেও গোলের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। নির্ধারিত সময় শেষে শেষ বাঁশি বাজতেই হতাশায় ভেঙে পড়েন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা। অন্যদিকে স্বাগতিক ভারত নিজেদের ইতিহাসে ষষ্ঠবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে।
তবে এই পরাজয়েও গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে বাংলাদেশের জন্য। টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠা, পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে সমানে সমান লড়াই দেশের নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রারই প্রতিফলন। শিরোপা হাতছাড়া হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে বাংলাদেশ।
ফাইনালের হতাশা হয়তো এখন কষ্ট দেবে, কিন্তু এই দলটির বয়স, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা বিবেচনায় ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের বিশ্বাস রাখতেই পারে দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। বাংলাদেশের মেয়েরা প্রমাণ করেছে, তারা শুধু সাফের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের অন্যতম মানদণ্ডও বটে।
এসআর