[email protected] বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ

আবেগ, লড়াই ও প্রত্যাবর্তনের গল্প- ফাইনালে বাংলাদেশ নারী দল

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৬ ৯:৪৪ পিএম

আবেগ, লড়াই ও প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য গল্প লিখে নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

সেমিফাইনালের আগে সতীর্থ শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুসংবাদে শোকাহত ছিল বাংলাদেশ দল। সেই আবেগকে শক্তিতে পরিণত করে নেপালের বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত লড়াই, অসাধারণ মানসিক শক্তি এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ভরা এক ম্যাচে ঋতুপর্ণা চাকমা ও সাগরিকার গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। তবে ম্যাচের শুরুতে আক্রমণের ধার ছিল নেপালের দিকেই বেশি। প্রথম থেকেই বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে চাপে রাখার চেষ্টা করে তারা। দ্রুত বল আদান-প্রদান এবং উইং ব্যবহার করে বারবার বাংলাদেশের ডিফেন্সে আক্রমণ চালায় নেপালের মেয়েরা।

ম্যাচের ২৩তম মিনিটে সেই চাপ থেকেই এগিয়ে যায় নেপাল। একটি কর্নার কিক থেকে বক্সের ভেতর তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে গীতা রানা বল জড়িয়ে দেন বাংলাদেশের জালে। গোল হজমের পর কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। কয়েক মিনিট নেপাল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখলেও ধীরে ধীরে খেলায় ফিরতে শুরু করে পিটার বাটলারের শিষ্যরা।

পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ মাঝমাঠে নিজেদের সংগঠিত করে। মনিকা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা ও সাগরিকারা আক্রমণে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে নেপালের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করতে কিছুটা বেগ পেতে হয় বাংলাদেশকে।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে এসে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এরই ফল মেলে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে। ডান প্রান্ত থেকে পাওয়া একটি কর্নার কিক নিতে যান ঋতুপর্ণা চাকমা। সবাই যখন বক্সের ভেতরে ক্রসের অপেক্ষায়, তখন অবিশ্বাস্য এক শটে সরাসরি বল পাঠিয়ে দেন জালে। ঋতুপর্ণার অসাধারণ সেই গোল মুহূর্তেই ম্যাচে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশকে।

গোলটি শুধু স্কোরলাইন সমতায় ফেরায়নি, পুরো দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয়। প্রথমার্ধ শেষে ১-১ সমতায় বিরতিতে যায় দুই দল।

বিরতির পর ম্যাচ আরও জমে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধে নেপাল একাধিকবার বাংলাদেশের রক্ষণভাগে আক্রমণ চালায়। কয়েকটি সুযোগ থেকে গোলের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা দুর্দান্ত দৃঢ়তা দেখান। বিশেষ করে গোলরক্ষক মিলি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশও পাল্টা আক্রমণে কম যায়নি। সাগরিকা, ঋতুপর্ণা ও আফঈদারা নেপালের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। দুই দলের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ম্যাচে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সময় যত গড়াতে থাকে, অতিরিক্ত সময়ে খেলা যাওয়ার সম্ভাবনাও ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে আসে বাংলাদেশের জন্য স্বপ্নের সুযোগ। দ্রুতগতির এক আক্রমণে নেপালের রক্ষণভাগকে ভেঙে সামনে এগিয়ে যান সাগরিকা। সুযোগ পেয়েই তিনি নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে দেন প্রতিপক্ষের জালে। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশের ডাগআউট ও গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরা।

সাগরিকার সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর আর ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায়নি নেপাল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা। মাঠজুড়ে শুরু হয় উদযাপন।

তবে এই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, ত্যাগ এবং দলের ঐক্যের এক অনন্য গল্প।

সেমিফাইনালের আগে বাংলাদেশ দলের ডিফেন্ডার শিউলি আজিম তাঁর মায়ের মৃত্যুসংবাদ পান। জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এমন একটি খবর পুরো দলকেই নাড়া দেয়। পরিবারের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মায়ের শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি শিউলি। কিন্তু জাতীয় দলের দায়িত্ব এবং সতীর্থদের সমর্থন তাঁকে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে।

ম্যাচ শেষে জানা যায়, দলের খেলোয়াড়রা এই জয় উৎসর্গ করেছেন শিউলি ও তাঁর প্রয়াত মায়ের স্মৃতির প্রতি। সতীর্থদের এই মানবিক সংহতি এবং মাঠের পারফরম্যান্স জয়টিকে আরও বেশি আবেগঘন করে তুলেছে।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি প্রমাণ।

এখন বাংলাদেশের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। ফাইনালে জিততে পারলে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা নিজেদের করে নেওয়ার গৌরব অর্জন করবে দলটি। সেই লক্ষ্যে আত্মবিশ্বাসী পুরো স্কোয়াড।

নেপালের বিপক্ষে এই জয় দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আছে বাংলাদেশের মেয়েদের। আবেগ, সংগ্রাম, ঐক্য এবং লড়াকু মানসিকতার এক অনন্য প্রদর্শনী হয়ে থাকবে এই সেমিফাইনাল। 

এই টুর্নামেন্টে ফাইনালে ওঠার পথটা মোটেও সহজ ছিল না বাংলাদেশের জন্য। গ্রুপ পর্বে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে হার এবং মালদ্বীপের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয় দলটির সামর্থ্য ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দল ব্যবস্থাপনা ও ম্যানেজারকে ঘিরেও নানা বিতর্ক ছিল আলোচনায়।

সেমিফাইনালে শক্তিশালী নেপালের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাংলাদেশকে নিয়ে শঙ্কাই ছিল বেশি। তবে সব সমালোচনা, বিতর্ক ও সংশয়কে পেছনে ফেলে অসাধারণ লড়াইয়ে নেপালকে হারিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে, বড় মঞ্চে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ভারতের কাছে হার, মালদ্বীপের বিপক্ষে সংগ্রাম, নানা বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ পারফরম্যান্স—সবকিছুর পরও শেষ হাসিটা আপাতত বাংলাদেশের। নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার এই অর্জন মনে করিয়ে দেয়, চ্যাম্পিয়নরা কখনো শুধু জয়ে নয়, প্রতিকূলতা জয় করেও নিজেদের পরিচয় দেয়। এখন টানা তৃতীয় শিরোপা জয় থেকে মাত্র একটি ম্যাচ দূরে বাংলাদেশের মেয়েরা; আর তাদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখছে পুরো বাংলাদেশ।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর