ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করার ঘটনা সমাজে প্রায়ই দেখা যায়।
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই ‘বাবা-মায়ের অনুমতি’ এবং ‘ওলির অনুমতি’—এই দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা ও অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিকাহের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল আলোচনার বিষয় হলো শরিয়ত নির্ধারিত ওলি এবং বিয়ের অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে কি না। ফলে শুধু বাবা-মা সম্মতি দেননি—এই একটি কারণেই সব পরিস্থিতিতে নিকাহ অবৈধ বলে দেওয়া যায় না।
হাদিসে ওলির গুরুত্বের কথা এসেছে। জামে তিরমিজিতে হজরত আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওলি ছাড়া নিকাহ নেই।’ হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে ওলির অনুমতি ছাড়া কোনো নারীর বিয়ের বিষয়ে নিকাহ বাতিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের বর্ণনার ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ নারীর নিকাহে ওলির উপস্থিতি বা অনুমতিকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিরোধ বা উপযুক্ত ওলি না থাকার পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের ওলি হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও ফিকহে আলোচিত হয়েছে।
ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী, ওলির অনুমতি ছাড়া নারীর নিকাহ সহিহ হয় না। সে হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী বৈধ ওলির অনুমতি ছাড়া নিজ উদ্যোগে বিয়ে করলে ওই নিকাহ বৈধ হবে না। এখানে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়াটা মূল বিষয় নয়; বরং নিকাহের ক্ষেত্রে ওলির শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে হানাফি মাযহাবে ভিন্ন মত পাওয়া যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন নারী নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিজের নিকাহ নিজে সম্পন্ন করতে পারেন। তাই কেবল ওলির অনুমতি না থাকার কারণে এমন নারীর নিকাহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলা হয় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে হানাফি মাযহাব পরিবারকে অমান্য করে গোপনে বা পালিয়ে বিয়েকে উৎসাহিত করে। নিকাহের ক্ষেত্রে অন্যান্য শরিয়তি শর্তও পূরণ করতে হয়।
ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মোহর এবং পাত্র-পাত্রীর বৈধতা ও উপযুক্ততার বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া জরুরি। পাত্র শরিয়তের দৃষ্টিতে উপযুক্ত কি না, সেটিও ফিকহে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তাই ‘হানাফি মাযহাবে মেয়েরা ওলির অনুমতি ছাড়াই যেকোনো ব্যক্তিকে যেকোনোভাবে বিয়ে করতে পারে’—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বাড়ি ছেড়ে যাওয়া, কোথাও একসঙ্গে থাকা কিংবা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া—এসবের কোনোটিই নিজের মধ্যে ইসলামী নিকাহের বিকল্প নয়। শরিয়ত নির্ধারিত নিয়ম ও শর্ত অনুসরণ করেই নিকাহ সম্পন্ন হতে হয়। ফলে শুধু পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কোনো নারী-পুরুষ ইসলামী আইনে স্বামী-স্ত্রী হয়ে যান না।
অন্যদিকে নারীর নিজের সম্মতির বিষয়টিও ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে পূর্বে বিবাহিত নারী ও কুমারী নারীর বিয়ের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও অনুমতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সুনানে আবু দাউদের একটি বর্ণনায় এমন ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে এক নারী তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পিতা বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং তাকে সিদ্ধান্তের অধিকার দেন।
ইসলামে ওলির দায়িত্বকে মেয়ের ওপর সীমাহীন কর্তৃত্ব হিসেবে দেখা হয় না। আবার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অর্থও পরিবারের সব পরামর্শ উপেক্ষা করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। নিকাহের ক্ষেত্রে নারী, ওলি ও পরিবারের অধিকার-দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যে শরিয়তসম্মত ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার কোনো পাত্রের বিরোধিতা করলে আপত্তির কারণও যাচাই করা প্রয়োজন। পাত্রের চরিত্র খারাপ হওয়া, মাদকাসক্তি, প্রতারণা, সহিংসতা, দায়িত্বহীনতা বা সংসার পরিচালনায় অক্ষমতার মতো বাস্তব কারণ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে শুধু অর্থ, বংশ, সামাজিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত অহংকারের কারণে উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করাও ন্যায়সংগত নয়। শেষ পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার, দায়িত্ব এবং শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত বিবেচনায় নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
এসআর