[email protected] বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩

আশুরা: ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহর অনুগ্রহের স্মরণীয় দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২৬ ৮:২৬ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ইসলামী হিজরি সনের সূচনা হয় মহররম মাস দিয়ে। ইসলামে এ মাসকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাসগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।

পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মহররম মুসলিমদের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ বলে উল্লেখ করেছেন, যা এর বিশেষ মর্যাদার পরিচায়ক।

 

মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ তারিখ, যা ‘ইয়াওমে আশুরা’ নামে পরিচিত। ‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ। তবে এই দিনের গুরুত্ব কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নবীদের ইতিহাস, আল্লাহর রহমত এবং সত্যের বিজয়ের নানা স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।

 

ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে, বিভিন্ন যুগে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল, হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকার নিরাপদে অবতরণ, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আগুন থেকে মুক্তি, হজরত ইউনুস (আ.)-এর উদ্ধার এবং হজরত আইয়ুব (আ.)-এর রোগমুক্তির মতো ঘটনাগুলো আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।

 

তবে নির্ভরযোগ্য হাদিসে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যে ঘটনা পাওয়া যায়, তা হলো হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তির ঘটনা। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মদিনায় আগমনের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখেন যে ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এই দিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মুসা (আ.) রোজা পালন করেছিলেন।

 

এ ঘটনা শোনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে মুসা (আ.)-এর সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক আরও গভীর। এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদের তা পালনের উৎসাহ দেন।

 

আশুরার রোজার মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন যে, আল্লাহর কাছে আশা করা যায় এই রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের ছোটখাটো গুনাহের জন্য ক্ষমার কারণ হবে। এ কারণে যুগে যুগে মুসলিমরা এই দিনটিকে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে আসছেন।

 

রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজার গুরুত্ব আরও বেশি ছিল। পরে এটি নফল ইবাদত হিসেবে থেকে গেলেও এর ফজিলত অটুট রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ মহররমও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সে কারণে ইসলামী আইনবিদরা ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে রোজা রাখাকে উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন।

 

ইসলামের বিশিষ্ট আলেম ও মুফাসসিরগণ আশুরার রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চার মাযহাবের ফকিহরাও এর বিশেষ ফজিলতের ব্যাপারে একমত।

 

আশুরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারবালার স্মৃতি। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররমে কারবালার ময়দানে মহানবীর (সা.) প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। তার আত্মত্যাগ মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে ন্যায়, সত্য ও আদর্শের জন্য সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

 

তবে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আশুরার মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, রোজা পালন, নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা।

সাহাবায়ে কিরাম ও প্রথম যুগের মুসলমানরা এই দিনকে ইবাদত ও চিন্তন-মননের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। তাই আশুরা মুসলিমদের জন্য ইতিহাস, শিক্ষা, ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ।

এসআর

সম্পর্কিত খবর