ইসলামে কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, ত্যাগ ও তাকওয়ার অনন্য প্রকাশ। প্রতি বছর জিলহজ মাস এলে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব বা
আবশ্যক হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে ২০২৬ সালের কুরবানির নেসাব, কার ওপর এটি ফরজ এবং বর্তমান বাজার অনুযায়ী আনুমানিক কত টাকা থাকলে কুরবানি দিতে হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
কুরবানি কার ওপর ওয়াজিব?
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যার ওপর জুমার নামাজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলি পাওয়া যাবে এবং যিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন, তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার মূল শর্তগুলো হলো: ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে এবং ১০ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-কাওসারে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, "অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।" এই আয়াতটি কুরবানির গুরুত্ব ও তা আদায়ের স্পষ্ট নির্দেশনা বহন করে।
কুরবানির নেসাব ও সম্পদের হিসাব
কুরবানির নেসাব নির্ধারিত হয় স্বর্ণ বা রুপার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। শরিয়ত অনুযায়ী, স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি অথবা রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরিকে নেসাব ধরা হয়। বর্তমান সময়ে স্বর্ণের তুলনায় রুপার দাম অনেক কম হওয়ায়, আধুনিক ফকিহ বা ইসলামি চিন্তাবিদগণ সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে রুপার নেসাবকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। এই নিয়ম অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ওই তিন দিন কোনো ব্যক্তির কাছে যদি সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা, সোনা, অলংকার, ব্যবসায়িক পণ্য কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ (যেমন অতিরিক্ত জমি, বাড়ি, গাড়ি বা আসবাবপত্র) থাকে, তবে তার ওপর কুরবানি দেওয়া আবশ্যক হয়ে যায়।
এ বছর কত টাকা থাকলে কুরবানি দিতে হবে?
নেসাবের আর্থিক পরিমাণটি মূলত রুপার তৎকালীন বাজারদরের ওপর নির্ভর করে। ২০২৬ সালের বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা প্রায় ৩ হাজার ৫৬৮ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। সেই হিসাবে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে নিজের যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ এবং ঋণ বাদ দেওয়ার পর যদি কোনো মুসলমানের কাছে নগদ বা সম্পদ মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ টাকা বা এর সমপরিমাণ মূল্য থাকে, তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কুরবানির দিনগুলোতে রুপার দাম কিছুটা কমবেশি হতে পারে, তাই ওই নির্দিষ্ট সময়ের বাজারদর দেখেই চূড়ান্ত হিসাব নিশ্চিত করতে হবে।
হাদিসের কঠোর সতর্কবার্তা ও কুরবানির ফজিলত
যাদের কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু তারা অলসতা বা কৃপণতাবশত কুরবানি করেন না, তাদের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "যার কুরবানির সামর্থ্য আছে, তবুও সে কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।" অপরদিকে, সঠিক নিয়মে কুরবানি আদায়ের রয়েছে বিশাল ফজিলত। সুরা আল-হাজে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির গোশত বা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।" এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কুরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল আর নেই। সুতরাং, নিজের ভেতরের কৃপণতা ও দুনিয়াপ্রীতি ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদের সঠিক হিসাব করে কুরবানি আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুমিনের দায়িত্ব।
এসআর